ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকুশলতা নিয়ে কিছু কথা

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকুশলতা নিয়ে কিছু কথা
×

এম এম আকাশ

এম এম আকাশ

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:২৭ | আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৮

আমরা যখন কোনো সরকারকে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ বলি তখন ধরে নিই– সেটি দীর্ঘমেয়াদি সরকার হবে না। সেই হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের মেয়াদ হতে পারত সর্বোচ্চ ছয় মাস বা কিছু বেশি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ফিরে আসা বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ তিন মাস।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ কত? ছয় মাস, এক বছর, দেড় বছর, দুই বছর, তিন বছর, নাকি পাঁচ বছর, নাকি অনির্দিষ্ট কোনো কাল? যদি পাঁচ বছর বা ততোধিক হয় তাহলে এটি অন্তর্বর্তী সরকার নয়; একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকার হলো। সে হিসেবে তার কর্মকাণ্ড যেমন হবে দীর্ঘমেয়াদি, তেমনি তার মূল্যায়নের মানদণ্ডও হবে সেই মেয়াদভিত্তিক। আমরা তখন তার কাছ থেকে নানা ধরনের মৌলিক অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা করব এবং নিয়োগকারী বা নিজেদেরই ইচ্ছা অনুযায়ী সেই সরকার সেগুলো প্রণয়ন ও পূরণের চেষ্টা করবেন। তাদের ব্যর্থতা বা সাফল্য তখন সেগুলো পূরণের মাত্রা দ্বারা নির্ধারিত হবে। ভুল হলে নিয়োগকারীরা তাঁকে বদল করে দেবেন অথবা তারা নিজেরাই ব্যর্থ হয়েছেন বলে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেবেন। 

এ সরকারের নিয়োগকারী কারা এবং তাদের প্রত্যাশা কী ছিল? কিছু মানুষ তো প্রকাশ্যে এ সরকারকে বসাতে কাজ করেছেন, যাদের আমরা চিনি। তাদেরই কেউ কেউ এখন হতাশা ব্যক্ত করে বলছেন– ‘বিপ্লব বেহাত হয়ে গেছে।’ কিন্তু এ প্রক্রিয়ার পেছনে কারা ছিলেন, তা নিয়ে নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। 

১৫ বছর স্বৈরাচারের জগদ্দল পাথরের নিচে হাঁসফাঁসকারী শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসেছে, এটাই আমরা জানি। তবে ইদানীং দেশে-বিদেশে অনেকের সন্দেহ– এখানে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ছিল। সুতরাং, ড. ইউনূসের কাছে প্রত্যাশা দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে।

প্রথমত: যদি স্বতঃস্ফূর্ত গণশক্তিই তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়ে থাকে তাহলে তাঁর নিয়োগকারী মূলত জনগণ। সেই জনগণ ও ছাত্রসমাজের বড় বড় সংস্কারের প্রত্যাশা নিশ্চয়ই থাকবে। প্রত্যাশা থাকবে, তিনি শুধু স্বৈরাচারের বিচার করবেন না; স্বৈরাচারের আমলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেবেন; স্বৈরাচারের প্রধান শিকড়গুলোও উৎপাটিত করে গণতন্ত্রকে নিষ্কণ্টক করবেন। তিনি কোটা বৈষম্য দূর করবেন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী করে শিক্ষার্থীদের চাকরির বন্দোবস্ত এবং শেষ পর্যন্ত সারাদেশে তিনি শূন্য বেকারত্ব তৈরির জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন; উচ্চতর প্রবৃদ্ধি বা নিম্নতর দারিদ্র্য অর্জন করতে না পারলেও অবস্থার অবনতি যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করবেন ইত্যাদি।

আর যদি কোনো আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-এর বিষয়টি সত্য হয়, তাহলে সেই ডিজাইনার বা নকশাকারীদের প্রত্যাশা পূরণে বিশেষ ধরনের সাংবিধানিক সংস্কার এবং চুক্তিগুলো কার্যকর করবেন। সে জন্য যে কয় দিন তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে হয় তিনি থাকবেন। 

তবে যেভাবেই তিনি বিদায় নেন না কেন; পরবর্তী সরকারপ্রধান হবেন কে– সেটিও এক বড় প্রশ্ন। সেটিও আবার নির্ভর করে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দল জয়ী হয় তার ওপর। আবার সেই পরবর্তী সরকার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নিয়ে ভবিষ্যতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ বা আপদ-বিপদ, আশীর্বাদ-অভিশাপের মুখোমুখি হতে পারে, সে সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে রয়েছে।

যা হোক, প্রথমেই আমি ইউনূস সরকারের অন্তর্বর্তী চরিত্রের কারণে তাঁর কাছে শিক্ষার্থী-জনতার সীমিত ন্যূনতম অর্থনৈতিক প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরব। তারপর সে ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য-ব্যর্থতা নির্দেশ করব। তারপর সে সবের বাইরে তাঁর স্ব-উদ্যোগে করা বাড়তি সংস্কারগুলোর কথাও উল্লেখ করব। গোপন কোনো এজেন্ডার অংশ হোক বা না হোক, সেগুলোরও সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে মতামত দেব।
যেমন, শেষ মুহূর্তে এসে তিনি সামান্য কিছু (যা দেশি বিনিয়োগ দ্বারাও সম্ভব ছিল) বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য আমাদের স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক বন্দর ব্যবস্থাপনাকে এবং বন্দর-সংক্রান্ত নির্মাণকর্মকে বিদেশি কর্তৃত্বে এক গোপন চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তর করেছেন। এটি জনগণের কোনো দাবি ছিল না। এটি তাঁর বাড়তি নিজস্ব উদ্যোগ এবং এর ব্যর্থতা-সাফল্যোর চেয়ে বড় কথা হচ্ছে আদৌ এই তাড়াহুড়ার প্রয়োজন ছিল কি? তদুপরি যুক্তিসংগতভাবে প্রশ্ন উঠেছে, ৩৩ বছরের জন্য তা অন্যের হাতে চলে যাবে; নিশ্চিতভাবে অনেক বন্দর শ্রমিক চাকরি হারাবে এবং আগেই মাশুল অত্যধিক বাড়িয়ে বিদেশিদের মুনাফা নিশ্চিত করায় দেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং হবেন। কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইনকে বাস্তবায়নের জন্য কি শেষ মুহূর্তে এটি করা হলো?

ড. ইউনূস সরকারের সীমিত সংস্কার উদ্যোগগুলো ও সীমিত সাফল্য

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, আমরা জরুরি সংকটগুলো মোকাবিলা এবং গতানুগতিক বাজেট পেশের পাশাপাশি বাজেট পলিসিতে এমন কিছু অভিনব কর্মসূচি যোগ করার চেষ্টা করব যেগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য ফুটপ্রিন্ট (নির্দেশনামূলক পায়ের ছাপ) হিসেবে টিকে থাকবে। তবে গত বাজেটের কর্মসূচি খতিয়ে দেখলে সহজেই দেখতে পাব, সেখানে কোনো আকর্ষণীয় ফুটপ্রিন্ট শেষ পর্যন্ত রাজস্বের অভাবের দরুন তৈরি করা যায়নি। প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে সবই হয়েছে গতানুগতিক প্রচেষ্টা মাত্র। এমনকি অতীত ঐতিহাসিক মাত্রা থেকেও সে অর্জনগুলো কমে গেছে। যদিও কেউ কেউ বলেন, আগের পরিসংখ্যান ছিল ফাঁপানো! 

প্রথমত: প্রবৃদ্ধির হার কভিডের পরই কমতে ছিল। ৫ শতাংশ থেকে তা ৪ শতাংশে নেমে আসে। সেটা উদ্ধার করার জন্য দ্রুত প্রচুর স্ফীতিমূলক বিনিয়োগ দরকার ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই কম থাকায় সরকারি বিনিয়োগ তাই জরুরি হয়ে পড়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন; ব্যাংকগুলোর সংস্কার করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ ত্বরান্বিতকরণ, সর্বোপরি টাকা পাচার ও খেলাপি ঋণ কমানোই ছিল ইউনূস সরকারের প্রধান কর্তব্য। আমার মতে, এটুকু প্রত্যাশাই ছিল ন্যূনতম ও স্বাভাবিক। 

কথায় বলে– বৃক্ষের পরিচয় ফলে। আমরা আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা ৩ থেকে ৪ শতাংশের আশপাশেই  আটকে আছি (বিশ্বব্যাংকসহ বেসরকারি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান যেমন সিপিডি ও সানেমের হিসাব দ্র.)। সুতরাং প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি ঠেকানো দূরের কথা, নিম্নতর প্রবৃদ্ধির আশঙ্কাই ভবিষ্যতের সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে রেখে যাচ্ছে ড. ইউনূস সরকার।
কেউ কেউ বলছেন, যদি নির্বাচিত একটি স্থিতিশীল সরকার তৈরি হয়; তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হবে। তখন প্রবৃদ্ধির হার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এটা নির্ভর করবে নির্বাচন-উত্তর সরকারটি কতখানি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে তার ওপর। যদি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হয় এবং রাজনৈতিক গোলযোগ শুরু হয়ে যায় তাহলে স্থিতিশীলতা না থাকার পাশাপাশি  প্রবৃদ্ধিও না বাড়তে পারে। সুতরাং কারও কারও ভাষায় ‘দোলাচল’, কারও কারও ভাষায় ‘তরল’ অবস্থার মধ্যেই আমাদের এখন পর্যন্ত থেকে যেতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় ধরনের প্রত্যাশার মধ্যে আছে দ্রব্যমূল্য হ্রাস, টাকার মান পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি। এ সব ক্ষেত্রে ফলাফল অবশ্য অবিমিশ্র খারাপ নয়। কিছু ভালো কিছু মন্দ।

আমরা দেখি শুধু জনগণ নয়, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও এ ধরনের মিশ্র অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্সের ভাষ্য, ২০২৫ সালে অর্থনীতির কোনো কোনো সূচকের নিম্নগামিতা থমকে দাঁড়ালেও প্রয়োজনীয় ঊর্ধ্বগামিতা এখনও নিশ্চিত হয়নি। তারা বলছেন, মার্চ ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। জানুয়ারি ২০২৫-এ এসে সেটা ৯.৯৪-এ পরিণত হয়। তবে তারা আশা করেন, সেটা মার্চ নাগাদ ৯.৭ শতাংশে নেমে আসবে।

মোদ্দাকথা, মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কোনো উল্লোখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ৯ শতাংশের আশপাশে এটা স্থির হয়ে আছে। প্রধান খাদ্য চালের দামও উচ্চমাত্রায় গিয়ে স্থির হয়ে আছে। সরকার এ ক্ষেত্রে ওএমএস বা উন্মুক্ত বাজার বিক্রয়ের নীতি গ্রহণ করে ট্রাক থেকে সময় সময় বাজারের চেয়ে কম মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ করতে চেষ্টা করেছে; সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বলেছে; কোনো কোনো পণ্যে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের নীতি গ্রহণ করেছে; দোকানে প্রাইস লিস্ট টানানোর কথা বলেছেন, কিন্তু সার্বিকভাবে এসব কৌশল ফলপ্রসূ হয়নি।

এনজিও মহল (বা নাগরিক কোয়ালিশন), ট্রেড ইউনিয়নগুলো বা বাম দলগুলো কিছু র‌্যাডিক্যাল কৌশলের প্রস্তাব দিয়েছিল। যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় কতিপয় খাদ্যপণ্যের জন্য আইনগতভাবে ভোক্তা অধিকার আইন তৈরি করে সরকারি দায়িত্বে হতদরিদ্রদের মাঝে সেসব নিত্যপণ্য বণ্টনের ব্যবস্থা করা বা ভোক্তা ও উৎপাদক সমবায়ের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতি মুনাফা কমানো, দরিদ্রদের জন্য রেশন বা খাদ্য-প্যাকেট নিয়মিত ইন্টারভালে সরবরাহের ব্যবস্থা, ছোট কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে উৎপাদন উপকরণ প্রদান, সংগঠিত নিম্নবিত্ত খাতে সৈনিকদের মতো রেশন প্রদান, ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা ইত্যাদি। সে রকম কোনো মৌলিক পদক্ষেপ এই সরকারের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়নি। যদিও আমরা এই সময় ‘তিন শূন্য’র ঘোষণাসহ অনেক বড় কথা এই সময় শুনেছি, এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

তবে রফতানি ও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি এই সময় সরকারকে কিছুটা বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। যদিও রপ্তানি আয় গত চার মাস ধরে নিম্নমুখী, ব্যবসায়ীদের সংস্থা মেট্রোপলিটান চেম্বারের মতে, এ সময় নানা প্রতিকূলতা (ট্রাম্পের প্রতিকূল নীতি) সত্ত্বেও রপ্তানির ক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক কোনো কিছু হয়নি। বার্ষিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার ১২.৫ শতাংশে মোটামুটি স্থির থাকে। 

এ সময়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণের কারণে মোট রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহ দ্রুত বেড়ে যায় এবং ডলার রিজার্ভের আয়তন যতটুকু পড়ে গিয়েছিল তা পুনরায় কিছুটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু এ জন্য টাকার মান ধাপে ধাপে অনেক কমাতে হয়েছে। অবশেষে আইএমএফ থেকে প্রতিকূল শর্তে টাকা ধার করতে হয়েছে। মুদ্রামান বাজারের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। তাতে অবশ্যই অন্যদিকে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

সবকিছু মিলিয়ে আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্যেও কিছুটা উন্নতি অর্জনে সরকার সক্ষম হয়েছে। এটা সরকারের ইতিবাচক কর্মকুশলতা। কিন্তু এ জন্য ক্রমাগত সরকারি ঋণ বেড়ে গেছে এবং সুদাসল পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরকারি উন্নয়ন ব্যয় এবং অনেক মেগা প্রকল্প কাটছাঁট করতে হয়েছে। 

কিন্তু এ ধরনের ব্যয় সংকোচন নীতি দ্বারা একদিকে উন্নতি হলেও অন্যদিকে যে প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে; বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অসাম্য বাড়ছে; শিল্পকারখানা ও সেবা খাতে ছাঁটাই হচ্ছে– অর্থনীতিবিদরা সেই দিকও তুলে ধরেছেন। তাদের সমালোচনা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতির মূল ও প্রধান লক্ষণ ছিল মন্দা ও মূল্যস্ফীতির সহাবস্থান। সহজভাবে অর্থনীতির টেক্সট অনুযায়ী এই ম্যাক্রো বা সামষ্টিক অবস্থাকে চিহ্নিত করা হয় স্ট্যাগফ্লেশন বা মন্দাস্ফীতি হিসেবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সেখানেই আটকে আছে।

এ কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আগামী দুই মাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি নাগাদ এ অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা টাকাওয়ালাদের প্রতিনিধিত্ব করেন ও সক্ষমতা রাখেন তারা মাঠে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এবার যখন অর্থ বিনিয়োগ শুরু করবেন তখন মাইক্রো অর্থনীতিতে কিছু প্রাণসঞ্চার হতে পারে। তবে এ আশঙ্কাও আছে, টাকার খেলার সঙ্গে সঙ্গে পেশিশক্তির খেলা শুরু হলে ‘প্রাণসঞ্চার’ না হয়ে ‘প্রাণঘাতী’ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনাও ঘটতে পারে। তখন বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। তাই অর্থনীতি ও রাজনীতির তরল এক অনিশ্চিত অবস্থায় আমরা বর্তমানে ঝুলে আছি।

‘কাঠামোগত পদক্ষেপ-দারিদ্র্য হ্রাস-বৈষম্য হ্রাস’ সম্ভব হয়নি

সর্বশেষে এই কথা বলে নিবন্ধটি শেষ করব, এ ধরনের অন্তর্বর্তী অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে কোনো মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার সম্ভব নয়। এমনকি তারা যদি ধনীদের ওপর কর বসিয়ে সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টন করতে অথবা ঋণ প্রবাহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার দিকে পরিচালিত করতে চায়, তাহলে প্রথমেই কর ও ঋণবিন্যাস বদলাতে হবে। সেটা বদলানোর জন্য একই সঙ্গে দক্ষতা, যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিচার করে ধনীদের বঞ্চিত করে নিচের উৎপাদনশীল এজেন্টদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে– ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে চুরমার, তার জন্য চাই শক্ত-কঠিন অঙ্গীকার, আত্মত্যাগ, সাহস, রাজনৈতিক গণসম্পৃক্তি, সর্বোপরি সংগঠিত ও সচেতন গণঅভিযান পরিচালনার সক্ষমতা। এসব গুণ এ ধরনের সরকারের নেই। পরবর্তী বিকল্প রাজনৈতিক সরকারের কতটুকু থাকবে, তাও বলা মুশকিল। তবে তারা নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে কিছুটা হলেও জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। তাই  তাদের বা পরবর্তী সরকারের কাছে এসব মৌলিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি না হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশও বোকামি। 

এম এম আকাশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক

আরও পড়ুন

×