ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নেতৃত্ব

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষায় বিএনপি

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষায় বিএনপি
×

এম হুমায়ুন কবির

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫৪

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল– জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং নির্বাচন অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার সেই নির্বাচন আমরা দেখেছি। তবে নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কাজও অন্তর্বর্তী সরকার সম্পন্ন করল। নির্বাচনটি আমি কয়েকটি সেন্টারে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার বিবেচনায়, এটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। দীর্ঘদিন পর আমরা একটি শান্তিপূর্ণ, উদ্দীপনাময় ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার পেয়েছি। ভয়ভীতিহীনভাবে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন। সে জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমি ধন্যবাদ জানাই। সর্বশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই জনগণকে; তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। 

এমন সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন কেবল সরকারের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জন্যও বড় অর্জন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশের প্রত্যাশিত উত্তরণ ঘটেছে, যেখানে মঙ্গলবার নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন। একই দিনে নতুন সরকারের মন্ত্রীদেরও শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে। পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনও একেবারে কম নয়, ৭৭টি। এর মধ্যে জুলাইযোদ্ধারাও আছেন। এবারের সংসদে নারী সদস্য এবং কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীও আছেন। কাজেই আমার ধারণা, এটি একটি প্রাণবন্ত সংসদ হবে। ইতিবাচক বিষয় হলো, নির্বাচন নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও বিরোধী জোটও এর ফল গ্রহণ করেছে। যদিও তারা ৩২ আসনে ফল পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে। তারপরও আমরা এ সংসদটি কার্যকর দেখব বলে মনে হয়। বস্তুত কার্যকর সংসদের বিকল্পও নেই। 

গণভোটে জনগণ ব্যাপকভাবে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। তার মানে, সংস্কারের যে পরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকার দিয়ে যাচ্ছে, সে এজেন্ডা বাস্তবায়নে সংসদের সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে বড় বড় অনেক কাজ হবে। যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় আরও কিছু আমরা উপহার পেতে পারি। সে জন্য সংস্কারের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। 

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মাধ্যমে একটা টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটছে। এ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে কেবল পাঁচ বছরের জন্যই নয়, বরং বলা যায়, আগামী ৫০ বছরের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা আমরা পেয়ে গেছি। জনগণ হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে তার ম্যান্ডেট দিয়েছে। সে জন্য টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ার প্রাথমিক ধাপ বলা যায় এ নির্বাচনকে। 

বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। যদিও আওয়ামী লীগের সময়ে দলটি প্রচণ্ড চাপে ছিল। বিএনপিকে ক্ষতি করার সব চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপির তেমন কোনো সাংগঠনিক ক্ষতি তারা করতে পারেনি। চাপের মুখেও বিএনপি তার সাংগঠনিক কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দেশে থেকে যারা বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা এই কৃতিত্ব পেতে পারেন। এখানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কৃতিত্বও বলার অপেক্ষা রাখে না। লন্ডনে থেকেও তিনি উপজেলা পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্বের খোঁজখবর রাখতেন। নিয়মিত ভিত্তিতে তিনি অনলাইনে কথা বলতেন। লন্ডন থেকেও তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তাতে দলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছে। তিনি ঢাকায় ফিরে যেভাবে সক্রিয় নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন, তাতে সরাসরিও তিনি তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চমৎকার এক সুযোগ পেয়েছেন। যার প্রমাণ এই নির্বাচনী ফলের মাধ্যমে আমরা সবাই দেখেছি। 

সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের প্রতি তারেক রহমানের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। স্বৈরশাসনের কারণে দেড় দশকে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত। গত দেড় বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক জটিল অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নানা কারণে প্রশ্নের সম্মুখীন। পাসপোর্টের মূল্যায়ন কমে যাওয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন আমরা। এসব দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবে গণভোটে মানুষের রায়কে সম্মান করে কাঠামোগত পরিবর্তনগুলোও করতে হবে। সংবিধানে সেভাবে বিষয়গুলো যুক্ত করার বিষয় আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছিল বৈষম্য বিনাশের লক্ষ্যে। তার মানে, তাদের জীবন-জীবিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য কর্মসংস্থানের বিষয়টি অগ্রাধিকারে থাকতে হবে। দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগও জরুরি। এর সঙ্গে সুশাসনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা বিনিয়োগ করবেন, সংগত কারণেই তারা মুনাফা তুলে আনতে চাইবেন। সেটা নিশ্চিতে সুশাসন ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই। তারেক রহমান যদি তা করতে পারেন এবং সবার মানবাধিকার নিশ্চিত করেন তবে তা নতুন উদাহরণ তৈরি করবে।

যদিও বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় যেভাবে ইচ্ছে করতে পারেন, এর একটা নেতিবাচক দিক আছে। অনেকে সেই আশঙ্কা যে করছেন, তা অমূলক নয় এ কারণে যে, অতীতের এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। আমি মনে করি, বিএনপি কিংবা তারেক রহমানের নেতৃত্বের পরীক্ষাটা সেখানেই হবে। তারা এই দৃই-তৃতীয়াংশ কি নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করবেন, নাকি দেশবাসীর কল্যাণে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করবেন, তা ঠিক করতে হবে। অভিজ্ঞতার আলোকে বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে তা দলটির জন্যই ভালো।

অন্যদিকে এবারের সংসদে বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। তাদের আসন হিসাব করলে বলা যায়, এটা দুপক্ষের জন্যই ‘উইন উইন’ হয়েছে। বলা চলে সবার জন্যই উইন উইন। একদিকে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে; অন্যদিকে জাতীয় সংসদে জামায়াতের আসন হয়েছে প্রায় চার গুণ। তরুণ প্রজন্মের দল এনসিপিও ছয়টি আসন পেয়েছে। নতুন দল হিসেবে এটা বড় অর্জন। এককভাবে তাদের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করে ভালো ফল করেছে। এনসিপির বড় পরিচয়, তারা জুলাইযোদ্ধা। জুলাই এজেন্ডা সামনে নিয়ে যেতে তাদের উপস্থিতি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে নিঃসন্দেহে। তার মানে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি– সবাই উইন করেছে। 

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টা বলি। নির্বাচনে জয়লাভের পর পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ আমাদের অংশীদার সবাই বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নতুন সরকারকে ভাবতে হবে। এটা জরুরি আরেকটা কারণে, যেহেতু এলডিসি থেকে আমাদের উত্তরণ এই বছরেই হচ্ছে, সে জন্য বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যাবে। পরিবর্তিত কাঠামোতে আমাদের অনেক বেশি উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। সে জন্য অভ্যন্তরীণ অনেক সংস্কারও করতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থায় নিয়ে নতুন সরকার সফলভাবে এসব পদক্ষেপ নিতে পারলে আমরা প্রত্যাশিত আগামীর অপেক্ষা করতেই পারি।

এম হুমায়ুন কবির: রাজনৈতিক বিশ্লেষক; যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও পড়ুন

×