ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অধিকার

নারী কৃষকের অদৃশ্য শ্রম ও স্বীকৃতি

নারী কৃষকের অদৃশ্য শ্রম ও স্বীকৃতি
×

উম্মে সালমা

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:৫৪

আমরা তাদের ‘কৃষক’ বলি না। তাই উঠানের প্রান্তে কিংবা ছাদের টবে যত্নে বড় করা লাউয়ের লতা, দু-চারখানা টমেটো-ঢ্যাঁড়স, হাঁস-মুরগির দু-একটা ডিম পরিবারের পাতে তুলে দিচ্ছেন, এমন কৃষকের সংখ্যাও আমাদের তেমন জানা নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি খাত, যার বিপুল সংখ্যক শ্রমশক্তির বড় অংশ নারী। দেশের মোট নারী শ্রমশক্তির প্রায় ৭৪ শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। কর্মক্ষম নারীরা বেশি যুক্ত আছেন শস্য উৎপাদন, গবাদি পশু পালন ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো অপরিহার্য কাজে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পারিবারিক কৃষি থেকে, যেখানে নারীরা বিভিন্ন ধরনের কাজে নিবিড়ভাবে জড়িত। পুরুষদের শহরমুখী হওয়া এবং কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত এক দশকে কৃষি খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৬ শতাংশ। ধান রোপণ ও মাড়াই, বীজ সংরক্ষণ, পশুপালন, খাদ্য প্রস্তুতকরণ, খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবার তথা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা ও অপুষ্টি প্রতিরোধে নারীদের ভূমিকা এখন আর কেবল সহায়ক বা গৃহস্থালি কাজ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তারা মূলধারার কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত।

ঐতিহাসিকভাবে নারীর এই কৃষি শ্রমকে ‘গৃহস্থালি বা পারিবারিক কাজ’ হিসেবে গণ্য করার কারণে কৃষি খাতে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের স্বীকৃতি নেই। শ্রমের ন্যায্য স্বীকৃতি তারা পান না। মজুরি বৈষম্য এখনও দূর হয়নি। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কৃষিকাজে নিয়োজিত মোট নারী শ্রমিকের প্রায় ৭২ শতাংশ অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক। একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিককে দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এ বঞ্চনা পরিবার ও সমাজে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও সীমিত করে। আবার কৃষি সার্ভিসের তথ্য বলছে, কৃষিতে শ্রমদানকারী নারীর ৪৫.৬ শতাংশ কোনো পারিশ্রমিক পান না এবং এই অস্বীকৃত শ্রমের ৬.২ ঘণ্টা পারিশ্রমিকহীন গৃহস্থালি কাজ হিসেবে জিডিপিতে প্রতিফলিত হয় না। অথচ বীজ সংরক্ষণ, বাছাই থেকে শুরু করে চারা রোপণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শস্য সংরক্ষণ, হাঁস-মুরগি পালন, এমনকি মৌ চাষ ও বায়োগ্যাস কার্যক্রমের মতো ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭টিতেই নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। 

বাংলাদেশের গ্রামীণ খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান কারিগর এই নারীরাই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন খাদ্য সংকট দেখা দেয়, তখন আপৎকালীন খাদ্য ব্যবস্থাপনার ভার তারাই বহন করেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী খাদ্য উৎপাদন জোগানের নানা পর্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও যাদের আমরা কৃষক বলি না, তাদের এই অবদানের স্বীকৃতি কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয়, মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও অত্যাবশ্যক।

নারী কৃষকের সবচেয়ে বড় বঞ্চনা ভূমি মালিকানায়। বাংলাদেশে মাত্র ৪-৫ শতাংশ নারীর হাতে রয়েছে জমির দলিল বা কার্যকর মালিকানা। গ্রামের ৯৬ শতাংশ পরিবারের জমিই স্বামীর একক মালিকানায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা উত্তরাধিকার, খাসজমি বিতরণ ও ভূমি বাজার– এই তিন উপায়ে ভূমির অধিকার পেয়ে থাকেন। প্রান্তিক নারীরা তাদের স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় অনুদানে জমির মালিকানা পেতে পারেন। তবে স্বামী বেঁচে না থাকলে বা সক্ষম পুত্র সন্তান না থাকলে স্ত্রী আর খাসজমির মালিক হতে পারেন না। ফলে দেখা যায়, দেশের এক-চতুর্থাংশ ভূমিহীন পরিবার নারীপ্রধান। জমির দলিল না থাকায় এই কিষানিরা কৃষক হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি পান না। কৃষিঋণ, বিনামূল্যের কৃষি উপকরণ ও সরকারি প্রণোদনার মতো সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। 

২০২৩ সালে প্রণীত কৃষিনীতিতে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ শিরোনামে একটি অধ্যায় যুক্ত হলেও সেখানে ‘নারী কৃষক’ হিসেবে কোনো স্বীকৃতি নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো মিলে মোট ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণ করেছে। ঋণগ্রহীতা পুরুষ কৃষকের সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ২৮৬; নারী কৃষকের সংখ্যা মাত্র ১৯ লাখ ২১ হাজার ৪২৪, যা সংখ্যায় পুরুষের অর্ধেক। নারী কৃষকের নেওয়া ঋণের পরিমাণও কম, যা কৃষিঋণ বিতরণ ও প্রাপ্তিতে বিদ্যমান বৈষম্যকে স্পষ্ট করে।

এ বছর জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে ২০২৬ সালকে আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হিসেবে পালন করছে বিশ্বের কৃষি সম্প্রদায়। বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্যশস্য ব্যবস্থায় নারী কৃষকদের সামনে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, কৃষি খাতে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা ও নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়নে জাতিসংঘের এই নারী কৃষক বর্ষের ঘোষণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। 
আমরা একটি আত্মনির্ভরশীল, সমতাভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নে এই আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ এই সময়ে বাংলাদেশের নারী কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বাংলাদেশের কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অমূল্য অবদানকে টেকসই করতে তাদের কেবল শ্রমশক্তি নয়, ‘কৃষক’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, ভূমি মালিকানায় সমতা, উত্তরাধিকার, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ুসহ যে কোনো দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি 
নীতি ও প্রণোদনায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই এখন জরুরি। 

উম্মে সালমা: সদস্য, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি
[email protected]

আরও পড়ুন

×