ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে এনআরসির বিপদ

পশ্চিমবঙ্গে এনআরসির বিপদ
×

গৌতম রায়

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:০৮

জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ঘিরে যে আশঙ্কা, আলাপ-আলোচনা ও উদ্বেগ আসামে শুরু হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে বাংলার দিকে আসতে শুরু করেছে। ত্রিপুরাও এই উদ্বেগ থেকে বাদ যাচ্ছে না। আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এখন অফিস-কাচারি, চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে দামি রেস্তোরাঁ- সব জায়গাতেই আলাপ-আলোচনা ও আড্ডার ভেতরে এনআরসি প্রসঙ্গ একেবার উঠে পড়ছে। এনআরসিকে ঘিরে প্রথাগত শিক্ষার আলো পাওয়া মানুষের ভেতরেও যেমন উদ্বেগ-আশঙ্কা, তেমনি প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মানুষের মনেও প্রবল দুশ্চিন্তা। স্বাধীনতার এতকাল পরও যদি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের নিজ বাসভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কা রাষ্ট্র কর্তৃক তৈরি হয়, তাহলে পরিবেশ-পরিস্থিতি যতটা আশঙ্কামূলক জায়গায় যাওয়ার কথা, ততটাই যেতে চলেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল আর রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল এনআরসিকে ঘিরে পরস্পর এমন একটা ছদ্ম সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিভ্রান্ত হতে শুরু করেছে।

বিগত লোকসভা নির্বাচনের ফলের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে গোটা সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি এই প্রচার চালাতে শুরু করেছে- এনআরসি ঘিরে হিন্দুদের কোনো আশঙ্কার কারণ নেই। অর্থাৎ, ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মবিশ্বাসের মানুষের জন্য একটি 'নির্দিষ্ট দেশ' হিসেবে তুলে ধরতে এভাবেই প্রচার করা হচ্ছে যে, গোটা বিশ্বে ভারতবর্ষ হবে হিন্দুদের একটি 'পীঠস্থান'। হিন্দুদের জন্য তথাকথিত স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে এনআরসির জুজুর ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়া, ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা, চরম বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার চরম নৈরাজ্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম সংকট- এসব বিষয় থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রের শাসকরা যখন এই পথে হাঁটছেন, তখন রাজ্যের শাসক এই এনআরসির বিষয়টি ঘিরে এমন অবস্থান নিচ্ছেন, যাতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রটি একটি বিশেষ ধরনের সুবিধাজনক জায়গায় এসে পৌঁছাতে পারে। ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার পাল্টা হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এ রাজ্যের শাসকরা গত কয়েক বছর অত্যন্ত সফলভাবে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের যেমন সুবিধা করে নিয়েছেন, তেমনি কেন্দ্রের শাসকদেরও সুবিধা করে দিয়েছেন।

এনআরসি বিতর্ক প্রবল হওয়ার আগেই গত লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের শাসকদের পক্ষ থেকে ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলতে শুরু করে দেওয়া হয়। এই ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার ভেতর দিয়ে এমন একটি পরিবেশ এই রাজ্যের শাসক পশ্চিমবঙ্গের বুকে গত ছয় মাসে কায়েম করেছেন, যার ফলে রুটি-রুজির তাগিদে ভিন রাজ্য থেকে এই রাজ্যে আসা মানুষ ক্রমে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই শুধু পড়ে যাচ্ছে না; তাদের জানমালের নিশ্চয়তা ঘিরেও সংশয় তৈরি হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্ভাবিত এই ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার পাল্টা হিসেবে ভারতবর্ষের অন্য অনেক রাজ্যে এরই মধ্যে বাঙালিবিদ্বেষী একটা মানসিকতার পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। যার জেরে সেইসব রাজ্যে রুটি-রুজির তাগিদে বিভিন্ন স্তরের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যেসব বাঙালি কর্মরত, তাদের জীবন-জীবিকা ক্রমে সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে শুরু করেছে। কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি একদিকে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষকে এটাই বোঝাতে চেষ্টা করছে- এনআরসি নিয়ে হিন্দুদের কোনো ভাবনার কারণ নেই। অর্থাৎ, এনআরসি ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গকে যে মুসলমানশূন্য করাটাই এদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য- সে কথাটাই আরএসএসের হাজারো রকমের শাখা সংগঠন ও তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির মধ্য দিয়ে অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ খুব জোর কদমে চলছে।

লোকসভা নির্বাচনের আগেই বুঝতে পারা গিয়েছিল, ভোটের ফল থেকে যদি বিজেপি একটা সুবিধাজনক অবস্থায় আসে, তাহলে মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ হিন্দুত্ববাদীরা গড়ে তুলবে। সেই অবরোধের পরিবেশকে অতিক্রম করে মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়ন করার ষড়যন্ত্র এনআরসির ভেতর দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন বিজেপি সফল করতে ব্যস্ত। এ পরিস্থিতি বিজেপির সহযোগী শক্তিগুলো পশ্চিমবঙ্গেও কায়েম করেছে। এনআরসি ঘিরে বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যেসব পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে, সে পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ভারতবর্ষের অ-বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা করে এসেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, যাকে অবলম্বন করে এনআরসির বিষয়টি নিয়ে বিজেপি আজ ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ভেঙে তছনছ করে ভারতবর্ষকে তথাকথিত হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়; অটল বিহারি বাজপেয়ির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে সেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন আজকের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামপন্থিরা সেদিন সংসদের ভেতরে ও বাইরে নাগরিকত্ব বিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি কী ধরনের সামাজিক বিভাজন চালানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তা নিয়ে সোচ্চার থেকেছেন। বামপন্থিরা সাধারণ মানুষকে বারবার বুঝিয়েছেন, নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধনী অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকার আনছে, সেই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের চিন্তা-চেতনার একদম আদিগুরু এমএস গোলওয়ালকারের 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ'তত্ত্বের বাস্তবায়ন।

গোলওয়ালকার তার 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ'তত্ত্বের ভেতর দিয়ে ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক হিন্দুদের বাসভূমি বলেই খুব সূক্ষ্ণভাবে একটি তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই তাত্ত্বিক অবস্থান নির্মাণের ক্ষেত্রে গোলওয়ালকার এটাও বলেছিলেন, রাজনৈতিক হিন্দুদের বাইরে যেসব মানুষ ভারতবর্ষে থাকবে, তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাবে না। নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার তাদের থাকবে না। তাদের থাকতে হবে রাজনৈতিক হিন্দুদের দাসানুদাস হিসেবে। অটল বিহারি বাজপেয়ি তার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী এনে গোলওয়ালকারের এই 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ'তত্ত্বকেই একটি আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন আরএসএস, অটল বিহারি বাজপেয়ি, বিজেপির সেই চেষ্টার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন আজকের এনআরসির ছদ্মবিরোধী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংঘ, বিজেপির সেই রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে মানুষের কাছে সংসদের ভেতরে-বাইরে তুলে ধরতে লড়াইয়ের জান কবুল করেছিলেন বামপন্থিরা। আজও পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এনআরসির নাম করে মানুষে মানুষে বিভাজন, হিন্দু-মুসলমানের বিভেদের প্রবাহ সৃষ্টি ও মুসলমানকে দেশছাড়া করার এই নোংরা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ড. মনমোহন সিংয়ের প্রথম দফার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে, প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র সাংসদ হিসেবে সংসদে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সময় তিনি সংসদের অধিবেশনকক্ষে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বাস্তবায়ন করার দাবিতে শুধু একাধিকবার সোচ্চার হয়েছেন, তাই নয়; পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করার দাবি নিয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে লোকসভার উপাধ্যক্ষ আটোয়ালজিকে কাগজের তোড়া ছুড়ে মারতেও দ্বিধা করেননি।

সেদিন মমতা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে মানুষ অবৈধভাবে প্রবেশ করছে- বিজেপির এ দাবির সঙ্গে এক সুরে সুর মিলিয়ে লোকসভার ভেতরে-বাইরে সোচ্চার হয়েছিলেন। আর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বলছেন, তিনি নাকি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু হতে দেবেন না। সাধারণ মানুষের কাছে এনআরসি ঘিরে এক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই সময়ের দুই চরিত্র আজ জলের মতো পরিস্কার।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এনআরসিবিরোধী যে অভিনয় মমতা করে চলেছেন, যে মমতা আজ পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা এনআরসি বাস্তবায়ন হতে দেবেন না বলে সোচ্চার দাবি জানাচ্ছেন, সেই মমতা কি একবারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন- বিরোধী নেত্রী হিসেবে সংসদের ভেতরে কেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বাস্তবায়নের দাবিতে প্রথম দফার ইউপিএ সরকারের আমলে এতবার সোচ্চার হয়েছিলেন? কেন তিনি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি লাগু করার দাবিতে লোকসভার উপাধ্যক্ষের দিকে কাগজের তোড়া ছুড়ে মেরেছিলেন? সাধারণ মানুষ যাতে খাদ্যের দাবিতে সোচ্চার না হয়, শিক্ষার দাবিতে সোচ্চার না হয়, বেকারত্ব নিরসনের দাবি না তোলে, স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবি না তোলে, সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা না তোলে; আদিবাসী, দলিত, তফশিলি জাতি-উপজাতিভুক্ত মানুষ যাতে তাদের অধিকার, কর্মসংস্থান ইত্যাদির প্রশ্ন না তোলে; সে জন্যই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এনআরসির জুজু সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে চলেছে।

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫-এর 'এ' অবলুপ্ত করে কাশ্মীরের মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রশ্নকে অন্য খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, সেই জঘন্য উদ্দেশ্য নিয়েই এনআরসিকে ঘিরে এই তোড়জোড়। ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীর থেকে অবলুপ্ত হওয়ার পর সেখানকার প্রতিটি অ-বিজেপি, প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী-সমর্থক এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার কী ভয়াবহভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষ কোনো প্রশ্ন না তুলতে পারে, সে জন্যই সামনে তুলে আনা হয়েছে এই এনআরসির মতো বিষয়টি। বিজেপি একদিকে এনআরসির বিষয়টি সামনে তুলে এনে তাদের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ব্যর্থতা এভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, অপর পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এনআরসি ঘিরে ভূমিকা সব রকমভাবে বিজেপিকেই সাহায্য করছে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ধ্বংস করে, এই দেশকে রাজনৈতিক হিন্দুদের মুক্তাঞ্চল করার যে বিষয়টির দিকে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে, এনআরসি হলো সেই ধাপেরই একটি জটিল অঙ্ক। সেই অঙ্কের যোগফল সংঘ-বিজেপিকে মিলিয়ে দিতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে দাবার চাল হিসেবে অত্যন্ত সূক্ষ্ণভাবে তুলে ধরতে আত্মনিবেদন করেছেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস।

ভারতীয় গবেষক

আরও পড়ুন

×