চলচ্চিত্র পর্যালোচনা
সবাই পারে না, দেলুপি পেরেছে
‘দেলুপি’ সিনেমার দৃশ্য
লুৎফর হাসান
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৪৪
শতভাগ অপরিচিত মুখ, সবাই প্রধান চরিত্র। ম্যান্ডেলা নামে একটি চলচ্চিত্র দেখেছিলাম নেটফ্লিক্সে। সেটি বছর কয়েক আগে। ম্যাডন অশ্বিন পরিচালিত তামিল সেই চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেন যোগী বাবু। রাজনৈতিক স্যাটায়ারের অনন্য দলিল হয়ে আছে সেই চলচ্চিত্র। একটি ভোটের জন্য প্রার্থীরা কতটা নিচে নামতে পারেন, কতটা ব্যক্তিত্বহীন হয়ে উঠতে পারেন, সেই দৃশ্য স্মাইল বা ম্যান্ডেলা নামে চরিত্রের ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে আমরা দেখেছিলাম।
সিনেমাটি দেখে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম, মনের মধ্যে খচখচানি ছিল। সেই ‘জীবন থেকে নেয়া’র পর প্রকৃতার্থে আমাদের তেমন কোনো রাজনৈতিক স্যাটায়ারের চলচ্চিত্র তৈরি হয়নি। তবে সেই আক্ষেপ অনেকটা মুছে দিল ‘শাটিকাপ’ নির্মাতা তাওকীর ইসলাম ও তাঁর টিম। তারা নির্মাণ করলেন ‘দেলুপি’। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পালাবদলের চলচ্চিত্র হিসেবে সিনেমাটি সবার আগে থাকবে। যারা একটা ভালো গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই ‘বাজেট’-এর অজুহাত তোলেন, বাজেট দিয়ে যাদের বড় স্বপ্নের সিনেমার কথা শুরু হয়, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে ‘দেলুপি’ দেখিয়ে দিল, বাজেট থাকলে সব হয়, তবে বাজেটের আগে থাকতে হয় ঝকঝকে একটা গল্প; যেখানে চরিত্র কথা বলে ওঠার পাশাপাশি গল্প নিজেই কথা বলতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকেশন। একটি নির্দিষ্ট জনপদই একটি চলচ্চিত্রের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে এবং সেই অঞ্চল দেখার জন্য দর্শকের মধ্যেও আকুপাকু শুরু হয়, সার্থকতা তো এখানেও। ফলে সিনেমাটি নানান কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, ভাবিয়ে তুলেছে।
আবার যারা চলচ্চিত্রের গল্প কী হবে বা বাজেটই বা কত দাঁড়াবে, সেসবের আগে কাস্ট করে নেয় বড় তারকাদের। গল্প নিয়ে কাজ করার আগে বাজেটের বড় অংশ চলে যায় তারকার পেছনে। তখন নির্মাতাদের সমঝোতা করতে হয় মূল গল্প বলার ক্ষেত্রে। শেষ পর্যন্ত তারকার নাম হয়, গল্প চলে যায় আড়ালে। অথচ দেলুপি এখানেই অনন্য। একদম শতভাগ অপরিচিত মুখ, সবাই প্রধান চরিত্র। প্রত্যেক চরিত্রের দিকে দর্শকের ঝোঁক থাকে গভীর। প্রথাগত অনেক সিস্টেমকেই সরিয়ে দিয়ে নিজেদের ডেডিকেশনকে জয়ী করে দেখিয়ে দিয়েছে ‘দেলুপি’। দেলুপি কোনো সাধারণ চলচ্চিত্র না। এককথায়, বহুদিন পর খাঁটি এক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। কেন? সিনেমা দেখা শেষে হল থেকে বেরুনোর পর দর্শক যদি নিজের ভাবনা নিয়ে বসে যায়, তার মনে হবে আরেকবার দেখে আসি, আরেকবার বুঝে আসি রাজনৈতিক বক্তব্য এভাবেও দেওয়া যায়। দেলুপিতে এটি ঘটছে।
সিনেমা শুরু হয়েছে খুলনার পাইকগাছার দেলুটি অঞ্চলের নদীর বাঁধ ভেঙে আকস্মিক প্লাবনের মাধ্যমে। নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এ অঞ্চলের প্রায় তেরো গ্রামের মানুষ ছুটছে আশ্রয়কেন্দ্রে। এর মধ্যে খবর আসে সরকার পতনের। স্থানীয় চেয়ারম্যানের পালিয়ে যাওয়া আর পনেরো বছর ধরে পালিয়ে থাকা সাবেক চেয়ারম্যানের ফিরে আসার মধ্যেই বানভাসি এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার দুরন্ত ছোটাছুটি।
দেশের পট পরিবর্তনে নানান জায়গায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য, আন্দোলনে ভূমিকা রাখা তারুণ্যের বিভাজন, গান-বাজনা ও যাত্রাপালার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, গ্রামের বেড়িবাঁধ নির্মাণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এলাকার উন্নয়নে সরকারের অবহেলা, বাঁধ নিয়ে এনজিওর হতাশাজনক ভূমিকা, নিজেরা বাঁধ নিয়ে হাতে হাত মিলিয়ে মানববন্ধন, তার মধ্যে গ্রামের এক তরুণ আর এক তরুণীর পালিয়ে যাওয়ার যেসব মুহূর্ত একই সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে, মনে হবে ঘটনাটা চোখের সামনে ঘটছে আর দর্শক মাত্রই সেই ঘটনার ভেতর দিয়ে যাতায়াত শুরু করে দিয়েছে।
আমাদের দেশে প্রকৃত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র আজকাল তেমন নেই বললেই চলে। এটি এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ। পাশাপাশি বন্যাদুর্গত অঞ্চলের মানুষের চোখভর্তি যে স্বপ্নের ঝিকিমিকি ‘ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই’, তা সময়ের এক ভিন্ন উচ্চারণ হয়েই থাকল।
চিরঞ্জিত বিশ্বাস, অদিতি রায়, পলাশ, জাকির এবং অন্যান্য যত চরিত্র সবাই দুর্দান্তভাবে নিজেদের চরিত্রে মিশে গেলেন। তবে আমার চোখ আটকে থাকল মিহিরের চরিত্রে অভিনয় করা সেই তরুণের কাছে। আমি এই ছেলের সবকিছু মনে রাখব। তাকে অন্যরকম মনে হয়েছে। দেলুপি চলচ্চিত্রে যারাই বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন, পুরোটাই উজাড় করে দিয়েছেন। শাটিকাপ, সিনপাট দেখে চূড়ান্ত মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাওকীর ও তাঁর টিমের দেলুপি আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবাবে বলে বিশ্বাস করি।
- বিষয় :
- চলচ্চিত্র
