মঞ্চজুড়ে খুদে শিল্পীদের জাদু
‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ নাটকের দৃশ্য
সামিও শীশ
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাট্যদল বটতলার শিশু বিভাগের নতুন প্রযোজনা ‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ দেখার অভিজ্ঞতা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও স্মরণীয় ছিল। সম্প্রতি নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এটি ছিল শিশুদের অভিনয়ের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স ‘অভিনয়ে হাতেখড়ি’-এর ষষ্ঠ আবর্তনের সমাপনী প্রদর্শনী। চার মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী কয়েক মাসের মহড়া শেষে পঁচিশজন প্রাণবন্ত শিশুশিল্পী তাদের অভিনয় দক্ষতা দর্শকদের সামনে তুলে ধরে। এটি নির্মিত হয়েছে জার্মান শিশু সাহিত্যিক ওটফিল্ড প্রুশলারের বিখ্যাত রচনা ‘ডাকাত হটজেনপ্লটজ’ অবলম্বনে। দেশীয় প্রেক্ষাপটে এর নাট্যরূপ দিয়েছেন শাম্মি আক্তার এবং নির্দেশনা দিয়েছেন হুমায়ুন আজম রেওয়াজ। গল্পে ডাকাত, শিশু, পরি, দাদি এবং নানা কল্পনাপ্রবণ চরিত্রের উপস্থিতি নাটকটিকে মজার, রঙিন ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ডাকাত চরিত্রটি ভয়ের পরিবর্তে হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপিত হওয়ায় শিশু দর্শকদের জন্য নাটকটি আরও উপভোগ্য হয়েছে।
নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়, জার্মানির এক পাহাড়ি গ্রামে প্রিয় দাদির জন্মদিনে তাঁর দুই নাতি ক্যাসপার্ল ও সেপেল একটি গান গাওয়া জাদুকরী ‘কফি-কল’ উপহার দেয়, কিন্তু কুখ্যাত ডাকাত হালুম সেটি চুরি করে নিয়ে যায়। ডাকাতকে ধরতে গিয়ে ক্যাসপার্ল উল্টো বন্দি হয় এবং হালুম তাকে এক খিটখিটে জাদুকরের কাছে আলু ছোলার গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দেয়। জাদুকরের প্রাসাদে কাজ করার সময় ক্যাসপার্ল জাদুর জলের সাহায্যে অভিশপ্ত এক ব্যাঙকে মুক্ত করে, যে আসলে ছিল এক রূপবতী পরি। মুক্ত হয়ে পরি তার পতঙ্গ বাহিনী (মৌমাছি ও প্রজাপতি) নিয়ে ক্যাসপার্ল, সেপেল ও পুলিশ কর্মকর্তা ডিম্পফেলমোসারের সঙ্গে যোগ দেয়। ডাকাতের গুহায় মৌমাছির হুল আর প্রজাপতির সুড়সুড়ির চোটে দিশেহারা হয়ে ডাকাত দল পরাস্ত ও গ্রেপ্তার হয় এবং কফি-কলটি উদ্ধার হয়। মঞ্চসজ্জা, আলো, পোশাক এবং সংগীত নাটকের পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলে। নীল, বেগুনি ও সোনালি আলোর ব্যবহার পুরো মঞ্চকে রূপকথার জগতে পরিণত করেছিল। শিশুশিল্পীদের সাবলীল অভিনয়, মুখের অভিব্যক্তি ও প্রাণচঞ্চল চলাফেরা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক অভিনয় দেখে মনে হয়েছে, তারা শুধু সংলাপ বলছে না, বরং চরিত্রের ভেতরে ঢুকে গেছে।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় ছিল শিশুশিল্পীদের আত্মবিশ্বাস ও মঞ্চে উপস্থিতি। এত অল্প বয়সে তারা যেভাবে সংলাপ, অভিব্যক্তি, চলন এবং দলগত অভিনয় সামলে নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। অনেক শিশুর জন্য হয়তো এটি ছিল প্রথম বড় মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা, কিন্তু তাদের পরিবেশনা দেখে তা বোঝার উপায় ছিল না। তারা আনন্দ, ভয়, হাস্যরস ও কৌতূহল খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। দর্শকদের করতালি প্রমাণ করেছে যে শিশুরা তাদের শ্রম, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে সবার মন জয় করতে পেরেছে।
এ ধরনের উদ্যোগ শিশুদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। থিয়েটার শিশুদের শুধু অভিনয় শেখায় না; এটি তাদের আত্মবিশ্বাসী করে, দলগতভাবে কাজ করতে শেখায়, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি উন্নত করে এবং কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে। বর্তমান সময়ে শিশুদের সৃজনশীল চর্চার সুযোগ কমে আসছে, তাই বটতলার মতো সংগঠনের এমন নিয়মিত আয়োজন সত্যিই মূল্যবান।
নাটকটি কেবল বিনোদনের জন্য নয়, শিশুদের মানসিক, সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতে সাহস, বন্ধুত্ব, বুদ্ধি ও ভালো-মন্দের পার্থক্য সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনী শেষে অংশগ্রহণকারী শিশুদের সনদপত্র ও বিশেষ উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এভারেস্টজয়ী নুরুন্নাহার নিম্মি, আয়রনম্যান মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আরাফাতসহ অনেকে।
- বিষয় :
- বিনোদন