সমাজ সংকটের রাজসিক পরিবেশনা
‘গোলমাথা আর চোখামাথা’ নাটকের দৃশ্য
আবু সাঈদ তুলু
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জার্মান নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখট আমৃত্যু বুর্জোয়ারীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন। তিনি সমাজের শোষিতের যন্ত্রণাকে দর্শকের সামনে জীবন্ত করে তুলে বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক জীবনের পথকে নির্দেশ করেছেন। এমনকি প্রসেনিয়াম থিয়েটার আর্চকে ভেঙে দিয়ে থিয়েটারকে গণমানুষের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। ব্রেখটের অতিপরিচিত নাটক ‘রাউন্ড হেডস অ্যান্ড পয়েন্টেড হেডস’। সম্প্রতি বাংলাদেশে স্পর্ধা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থিয়েটার কালেক্টিভ নাটকটি ‘গোলমাথা চোখামাথা’ শিরোনামে মঞ্চে এনেছে।
নাটকটি রূপকধর্মী, তাতে ব্যঙ্গবিদ্রূপের মাধ্যমে ক্ষমতা, বর্ণবাদ, সামাজিক বৈষম্য ও বুর্জোয়া-পলিতারিয়েতের সম্পর্ককে চিহ্নিত করে। সম্প্রতি বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মিলনায়তনে নাটকটি প্রদর্শিত হয়। ব্রেখট থেকে নাটকটির ভাষান্তর করেছেন অনিরুদ্ধ অনু। নির্দেশনায় মহসিনা আক্তার। নাটকের কাহিনি ‘ইয়াহু’ নামের একটি কাল্পনিক দেশের সামাজিক সংকট নিয়ে। অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ইবরিন নামে একজন নেতা ক্ষমতার দায়িত্ব নিয়ে সমাজে গোলমাথা ও চোখামাথাভিত্তিক জাতিভেদ বা বৈষম্য তৈরি করে নিজের আধিপত্য সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। ইবরিন যেন নাৎসিপ্রধান হিটলারের রূপক আর ভাইসরয় দেশের শাসক, পেটি বুর্জোয়া। নিজের স্বার্থের জন্যই সবসময় উন্মুখ, এমনকি পলায়নপর। ডি গুজম্যান একজন ধনী, জমিদার বা ভূস্বামী ও চোখামাথা। কার্লাস একজন ঋণগ্রস্ত দরিদ্র কৃষক। সে সহজ-সরল। ইবরিনের প্ররোচনায় সে বিশ্বাস করে চোখামাথাদের তাড়ালে তাদের সব দুঃখ ঘুচে যাবে এবং জমিদারদের হাত থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু প্রত্যেকেই যে স্বার্থপর তা বুঝতে তার দেরি হয়। সে সমাজে স্বপ্ন ও লোভ যেন একসঙ্গে গাঁথা। তার মেয়ে কলি কার্লাস প্রচণ্ড দারিদ্র্যের শিকার হয়ে পতিতাবৃত্তির পথে বেছে নিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে ইজাবেলা, করমোন্তিস প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। কাস্তে লিগ শোষিত ও বিদ্রোহী বিপ্লবী কৃষকদের সম্মিলন কণ্ঠস্বর। নাটকে নানা ঘটনা-উপঘটনায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-হাস্য-গীত-বাদ্য-অভিনয়ে ফুটে ওঠে শোষিত চিরকালই শোষিত হয়। কৃষক বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে নাটকটির কাহিনি এগিয়ে চলে।
নাটকে দরিদ্র কৃষক কার্লাস চরিত্রে তিতাস জিয়ার অনবদ্য অভিনয়, তাঁর শরীরভঙ্গি, বাচনিক সুস্পষ্টতা, সংলাপের বিশেষ ঝোঁক ও চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সৈয়দ জামিল আহমেদের চরিত্র নির্মাণে লোভী মানসিকতার অভিব্যক্তিগুলো ভিন্ন আরেক মাত্রা দান করেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় ২৪ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী মঞ্চ জীবন্ত করে তুলেছেন ‘ইয়াহু’ নামের দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট; যা সমকালীন বাংলাদেশেও দুর্লভ নয়।
নাট্যকার বের্টল্ট ব্রেখট ছিলেন মার্কসবাদী রাজনীতির সক্রিয় একজন বিপ্লবী বা কর্মী। ফলে তাঁর সব নাট্যচিন্তা জার্মানির আর্থসামাজিক-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসবাদী দর্শনজাত সমাজ পরিবর্তনের ভাবনাকে ঘিরে। তাঁর এলিনিয়েশন ভাবনার মূলে ছিল দর্শককে মোহাবিষ্টের বিপরীতে গভীর বাস্তববোধ তৈরি করা কিংবা এপিক থিয়েটারের মাধ্যমে দর্শকদের মধ্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা; যাতে সমাজের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ে। তিনি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, গণমানুষের পক্ষে।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় ব্রেখটের আদর্শের প্রতিফলন নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে।
ব্রেখটের এ নাটকটি ২০০২ সালে প্রথম মঞ্চে এনেছিল নাগরিক নাট্যাঙ্গন। নির্দেশনা দিয়েছিলেন ড. ইসরাফিল শাহীন। স্পর্ধার প্রযোজনাটি সে হিসেবে দ্বিতীয়। স্পর্ধার নির্দেশক মহসিনা আক্তারের নির্মিত নাটকটি বুর্জোয়া-নন্দন আশ্রিত বিনোদনধর্মী হলেও নাট্যগল্পের অন্তঃসূরে শ্রেণি দ্বন্দ্ব ও চরিত্র নির্মাণে ব্রেখটের সমাজদর্শনকে খুঁজেছেন। অভিনয়, গাঢ় চকচকে রঙের বহুমাত্রিক ব্যবহার, বৈচিত্র্যপূর্ণ সেট, উজ্জ্বলবর্ণের পোশাক, আলো-আবহ সংগীতে অনবদ্য উপস্থাপনা এ নাটক।
- বিষয় :
- সমাজ