বিস্ময়ের নাম ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’
‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’
রহমান লেনিন
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলচ্চিত্র কখনও শুধু গল্প বলে না, তার সময়কেও ধারণ করে। আবার কোনো কোনো চলচ্চিত্র সময়কে অতিক্রম করে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে দাঁড়ায় একটি প্রশ্ন হয়ে। পরিচালক সেসিল বি. ডিমিলে’র ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’ তেমনই একটি চলচ্চিত্র। ১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর রুপালি পর্দায় মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সাত দশক পর তাই এই চলচ্চিত্রের দিকে ফিরে তাকানো মানে শুধু একটি ধর্মীয় মহাকাব্যকে স্মরণ করা নয়, চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকানো।
আমার কাছে এই ফিরে দেখার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চলচ্চিত্রটির একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিও। কৈশোরে পা দেওয়ার আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মুভি অব দ্য উইক’-এ প্রথম দেখেছিলাম ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’। তখন সিনেমার ভাষা বুঝতাম না, চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। পর্দায় কীভাবে একটি দৃশ্য তৈরি হয়, বাস্তব আর কল্পনার মধ্যে ক্যামেরা কীভাবে সেতু তৈরি করে, এসব প্রশ্নও তখন মনে আসেনি। শুধু মনে হয়েছিল, পর্দার ভেতর যেন আমার পরিচিত পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় আরেকটি পৃথিবী খুলে গেছে। মিসরের রাজপ্রাসাদ, মানুষের বিশাল মিছিল, মরুভূমির বিস্তার, যুদ্ধ আর সমুদ্রের পানি বিভক্ত হওয়ার দৃশ্য আমাকে এক ধরনের গভীর বিস্ময়ে আচ্ছন্ন করেছিল। সেই বিস্ময়ের বয়স ছিল না, ছিল না কোনো চলচ্চিত্র-তত্ত্ব। ছিল শুধু দেখার আনন্দ এবং চোখের সামনে অসম্ভবকে সত্যি হয়ে উঠতে দেখার আশ্চর্য শিহরণ!
পরে আরও কয়েকবার দেখেছি। প্রতিবারই দেখার অভিজ্ঞতা এক ছিল না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সঙ্গে মনও যেন চলচ্চিত্রের গভীরতার ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করল। যে লোহিত সাগর একদিন আমাকে বিস্মিত করেছিল, আজ তার চেয়েও বেশি ভাবায় সেই মানুষগুলোর দীর্ঘ যাত্রা, যারা দাসত্বের জীবন পেছনে ফেলে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শৈশবের চোখে আমি দেখেছিলাম দৃশ্যের বিশালতা; আজকের চোখে দেখি সেই বিশালতার ভেতরে মানুষের ছোট ছোট ভয়, আশা, বিশ্বাস এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
মহান মোজেসের জীবন, মিসরের দাসত্ব এবং হিব্রুদের মুক্তির কাহিনি নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র চার্লটন হেস্টন-এর ‘মোজেস’ এবং ইউল ব্রিনার-এর ‘রামেসেস’ যেন দুই বিপরীত শক্তির প্রতীক। একদিকে সাম্রাজ্য ও ক্ষমতা, অন্যদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। পরিচালক ডিমিল এই দ্বন্দ্বকে শুধু সংলাপে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বাস্তব সেট, বিশাল জনসমাবেশ, আলোকসজ্জা ও অপটিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে তাকে পরিণত করেছেন দৃশ্যের মহাকাব্যে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল দৃশ্য নির্মাণের এই যুগে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যগুলো আজ প্রযুক্তিগতভাবে সরল মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষের অনুভূতির গভীরে পৌঁছালে প্রযুক্তির সীমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিস্ময় হয়তো চোখকে কিছুক্ষণ থামিয়ে রাখে কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি দৃশ্য তৈরি করে আর মানুষের অনুভূতি তাকে স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখে।
এখানেই ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’ ধর্মীয় আখ্যানের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। মোজেসের গল্প হয়ে ওঠে মানুষের স্বাধীনতার গল্প। দাসত্ব থেকে মুক্তি এখানে শুধু একটি জাতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা নয়, মানুষের চিরন্তন আত্মমর্যাদার আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক।
সময়ের সঙ্গে আমার দেখার চোখ বদলেছে কিন্তু বিস্ময় হারায়নি; বরং পেয়েছে নতুন অর্থ। একদিন যে চলচ্চিত্রের দৃশ্য আমাকে বিস্মিত করেছিল, আজ তার মানবিক গভীরতা আমাকে থামিয়ে দেয়। কৈশোরের বিস্ময় থেকে বর্তমানের উপলব্ধিতে এই যাত্রাই হয়তো একটি সত্যিকারের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সাত দশক পর ‘দ্য টেন কমান্ডমেন্টস’ তাই শুধু পুরোনো হলিউডের এক মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র নয়; এই চলচ্চিত্র ইতিহাসের এমন এক মাইলফলক, যেখানে প্রযুক্তির বিস্ময় এসে মিলেছে মানুষের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে। প্রযুক্তি বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, কিন্তু মানুষের মুক্তির স্বপ্ন আজও বদলায়নি।
লেখক: চলচ্চিত্রকর্মী ও নির্মাতা
- বিষয় :
- বিনোদন