ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রচলিত দেয়াল ভাঙার এক মঞ্চপ্রয়াস

প্রচলিত দেয়াল ভাঙার এক মঞ্চপ্রয়াস
×
×

কালযাত্রা নাটকের দৃশ্যে সাফিয়া খন্দকার রেখা

রেজাউল করিম

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন মৃত নারীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তাঁর মেয়েকে যখন একের পর এক বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন মৃত্যুর চেয়েও নির্মম হয়ে ওঠে জীবিত মানুষের তৈরি নিষেধের দেয়াল। থিয়েটার চারণিকের নাটক ‘কালযাত্রা’ এমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় দর্শককে। 
প্রিন্সেস মহিমার জানাজাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এই নাটক কেবল একজন নারীর শেষ ইচ্ছা পূরণের গল্প নয়; বরং শিল্পীর পরিচয়, নারীর সামাজিক অবস্থান, ধর্মের নামে আরোপিত বিধিনিষেধ এবং মৃত্যুর পরও মানুষের মর্যাদা নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার এক নাট্যপ্রয়াস।
নাট্যকার মাহফুজা হিলালীর রচনায় মহিমা একসময়ের যাত্রামঞ্চের আলোচিত শিল্পী। কখনও সীতা, কখনও দ্রৌপদী, কখনও বেহুলার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন। কিন্তু মঞ্চে নানা চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরলেও ব্যক্তিজীবনে তাঁর অপমান, ক্ষত ও না-পাওয়ার গল্প শেষ হয়নি। মৃত্যুর পর মেয়ে কুমকুমের সামনে মায়ের একটিমাত্র ইচ্ছা–জানাজা। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই চাওয়াটি ক্রমে হয়ে ওঠে সমাজের ধর্মীয় বিধান, সামাজিক নিষেধ ও ক্ষমতার হিসাবের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই। কুমকুমের এই যাত্রায় স্পষ্ট হয়, মানুষের চারপাশের সব দেয়াল ইট-পাথরে তৈরি নয়; পরিচয়, ভয়, সংকীর্ণতা ও সামাজিক বিচারও নির্মাণ করে দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
নাটকটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো যাত্রার ঐতিহ্যকে বর্তমানের সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা। মহিমার অভিনীত সীতা, দ্রৌপদী ও বেহুলার স্মৃতি যখন বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন মঞ্চের অভিনয় আর জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব কমে আসে। দ্রৌপদীর প্রশ্ন, সীতার অগ্নিপরীক্ষা কিংবা বেহুলার দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেন মহিমার জীবনের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। এভাবে নাটকটি লোকজ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে শুধু স্মরণ করে না, সমকালীন সমাজে নারীর অবস্থান বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করে।
‘কালযাত্রা’র বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্পী ও শিল্পের স্বাধীনতার প্রশ্ন। শিল্পকে কখনও ক্ষমতাবানদের আশ্রয়ে টিকে থাকতে হয়েছে, কখনও তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে হয়েছে। অথচ শিল্পীর কাজ মানুষের কথা বলা, সমাজের অসংগতি সামনে আনা। এই বাস্তবতায় নারীশিল্পীর অবস্থান আরও জটিল। সমাজের অবহেলা ও বৈষম্য তাঁকে মঞ্চের বাইরেও তাড়া করে ফেরে। মহিমার চরিত্র সেই দীর্ঘ বঞ্চনার প্রতীক হয়ে ওঠে।
নির্দেশক শামীম সাগর নাটকটিকে ধর্মবিরোধী বক্তব্য হিসেবে নয়; বরং ধর্মের নামে মানুষের তৈরি ক্ষমতা, ভয় ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি নাটকটির বক্তব্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে। 
সাফিয়া খন্দকার রেখার মঞ্চে অভিনয় এবং শামীম সাগরের নির্দেশনায় নির্মিত ‘কালযাত্রা’ থিয়েটার চারণিকের ধারাবাহিক নাট্যচর্চার একটি নতুন প্রয়াস। মাহফুজা হিলালীর রচনা নাটকটিকে দিয়েছে সামাজিক প্রশ্ন তোলার ভিত্তি; আর যাত্রাশিল্পের অনুষঙ্গ সেই প্রশ্নকে যুক্ত করেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে।
শেষ পর্যন্ত ‘কালযাত্রা’ দর্শকের সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন রেখে যায়: মৃত্যুর পরও যদি একজন মানুষকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া না যায়, তবে মানবিকতার দাবি কোথায়? জানাজার অধিকারকে ঘিরে কুমকুমের লড়াই তাই কেবল মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের সংগ্রাম নয়; এটি মানুষের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা। নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা এখানেই–মঞ্চের আলো নিভে গেলেও প্রশ্নগুলো যেন দর্শকের ভেতরে জেগে থাকে। 

আরও পড়ুন

×