সত্যের সন্ধানে পরিণীতির ‘রিপোর্টিং লাইভ’
‘রিপোর্টিং লাইভ’ সিনেমার পোস্টার
উপমা পারভীন
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সত্যের সন্ধানে ছুটছেন এক সাংবাদিক। সামনে একের পর এক রহস্য, পেছনে প্রভাবশালী অপরাধচক্র। যত অনুসন্ধান এগোচ্ছে, ততই ঘনিয়ে আসছে বিপদ। এমন এক গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার ‘রিপোর্টিং লাইভ’। ধ্রুব ত্রিপাঠী পরিচালিত ছবিটির ট্রেলার গত শনিবার প্রকাশ হয়েছে। দুই মিনিট দুই সেকেন্ডের ট্রেলারে সাংবাদিকের চরিত্রে বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়াকে দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন রূপে। সাংবাদিকের চরিত্রে এবারই প্রথম দেখা যাবে তাঁকে।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন সাংবাদিক সন্ধ্যা। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে সত্যের প্রতি তাঁর এক ধরনের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাও রয়েছে। কোনো ঘটনার ওপরের স্তর দেখে সন্তুষ্ট নন তিনি; বরং ঘটনার পেছনে থাকা মানুষ, উদ্দেশ্য ও যোগসূত্র খুঁজে বের করা তাঁর কাজ। সেই অনুসন্ধান একসময় তাঁকে নিয়ে যায় বেআইনি বালিখাদানের অন্ধকার জগতে। এই যাত্রায় সন্ধ্যার সঙ্গে রয়েছেন ক্যামেরাপারসন বিনোদ। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন দেবেন ভোজানি। একটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করেন, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবৈধ বালু ব্যবসা। অর্থের দিক থেকে অত্যন্ত লাভজনক এই ব্যবসাকে ছবিতে বলা হয়েছে ‘ব্রাউন গোল্ড’। এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে রয়েছে প্রভাবশালী একটি অপরাধচক্র।
প্রথমে ঘটনাটি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় বলে মনে হয়। তদন্ত যত এগোয়, ততই বদলে যায় পরিস্থিতি। সন্ধ্যা ও বিনোদ বুঝতে পারেন, তারা যে সত্যের পেছনে ছুটছেন, সেটি প্রকাশ্যে এলে অনেক ক্ষমতাবান মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে তাদের অনুসন্ধানের পথ আটকে দিতে শুরু হয় নানা ধরনের চাপ। আসে হুমকি, হামলা ও নজরদারি। একসময় নিজেদের জীবন বাঁচানো এবং সত্য প্রকাশ–দুইয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতিতেও পড়তে হয় তাদের।
ট্রেলারে সেই আবহের বেশ কিছু মুহূর্ত রয়েছে। ধাওয়া, মারধর, হামলা আর রক্তাক্ত সংঘর্ষের পাশাপাশি রয়েছে অনুসন্ধানের দৃশ্য। ক্যামেরার সামনে খবর সংগ্রহের চেয়ে ক্যামেরার বাইরে সত্য খুঁজে বের করা যে আরও কঠিন, ট্রেলারের বিভিন্ন দৃশ্যে সেটি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ছবিটি শুধু অপরাধের রহস্য উন্মোচনের গল্প নয়, সাংবাদিকতার ঝুঁকি ও দায়িত্বের কথাও বলে।
পরিণীতির নতুন রূপ
সন্ধ্যার চরিত্রটি পরিণীতির ক্যারিয়ারে আলাদা করে মনে রাখার মতো একটি কাজ হতে পারে। চরিত্রটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর কৌতূহল ও সাহস। ভয় পেলেও পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নন তিনি। সত্য সামনে না আসা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। নিজের চরিত্র প্রসঙ্গে পরিণীতি জানান, ‘রিপোর্টিং লাইভ’ তাঁকে এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছে, যা আগে কখনও করেননি। থ্রিলার ঘরানায় নেট ফ্লিক্সের সঙ্গে এ বছর এটি তাঁর দ্বিতীয় কাজ হলেও এবারের চরিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। সন্ধ্যার কৌতূহল, নির্ভীকতা এবং সত্য সামনে না আসা পর্যন্ত থেমে না যাওয়ার মানসিকতা তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে।
পরিণীতি আরও জানিয়েছেন, তাঁর জন্য চরিত্রটির আরেকটি আকর্ষণ ছিল সাংবাদিকতাকে পর্দায় তুলে ধরা। একজন সাংবাদিককে শুধু প্রশ্ন করতে দেখা যায় না; তাঁকে তথ্য যাচাই করতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয়, কখনও নিজের নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হয়। এই দিকগুলো চরিত্রটিকে তাঁর কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পরিণীতির ভাষায়, ‘এত গুণী অভিনেতার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও ছিল আমার জন্য বিশেষ। এখন দর্শকরাই বলবেন। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।’
কমেডির বাইরে দেবেন
সন্ধ্যার সঙ্গে অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী বিনোদ। ক্যামেরাপাসন হিসেবে তিনি শুধু ঘটনাগুলো ধারণ করেন না; বরং অনুসন্ধানের অংশীদারও হয়ে ওঠেন। চরিত্রটিতে দেবেন ভোজানির উপস্থিতি তাই বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কমেডি চরিত্রের জন্য পরিচিত দেবেনকে এবার অন্য ধরনের ভূমিকায় দেখা যাবে। পরিণীতির সঙ্গে তাঁর জুটিতে যেমন রয়েছে পেশাগত সমন্বয়, তেমনি বিপদের মুহূর্তে একে অন্যের ওপর নির্ভরতার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকের প্রশ্ন আর ক্যামেরাপাসনের লেন্স– দুই মিলেই গল্পের সত্য সামনে আসতে থাকে।
এই সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে রয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা অমল পালেকর। তাঁর পাশাপাশি অভিনয় করেছেন আদিল হুসেন, শেখর সুমন, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, নাসার, পিতোবাশ ত্রিপাঠী ও প্রাচী শাহ পাণ্ড্য। অভিজ্ঞ ও ভিন্ন ঘরানার শিল্পীদের এই সমন্বয় ছবির চরিত্রগুলোর বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে অমল পালেকরের মতো দীর্ঘ অভিনয়-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিল্পীর উপস্থিতি ছবিটির প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে। তাঁর চরিত্রটি গল্পের কোন স্তরে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা অবশ্য এখনও নির্মাতারা পুরোপুরি প্রকাশ করেননি। ফলে চরিত্রগুলোর সম্পর্ক ও উদ্দেশ্য নিয়েও রয়েছে কিছুটা রহস্য।
নির্মাতার প্রথম ছবি
‘রিপোর্টিং লাইভ’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক হচ্ছে ধ্রুব ত্রিপাঠীর। শুধু পরিচালনা নয়, মিহির যাদবের সঙ্গে যৌথভাবে ছবিটির চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি। ফলে গল্পের বিষয় নির্বাচন থেকে চরিত্র নির্মাণ এবং পর্দায় সেটির উপস্থাপন–পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ধ্রুব। প্রথম ছবিতে তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে অপরাধের পাশাপাশি পরিবেশ, অর্থনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। বেআইনিভাবে বালু উত্তোলন ঘিরে তৈরি হওয়া চক্রের গল্পকে সরাসরি তথ্যচিত্রের মতো না দেখিয়ে থ্রিলারের কাঠামোয় উপস্থাপন করা ছবিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ট্রেলারেও সেই ভারসাম্যের আভাস পাওয়া গেছে। বেআইনি বালু উত্তোলন শুধু একটি অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল অর্থ, প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার নানা সমীকরণ। সেই বাস্তবতার ভেতরে একজন সাংবাদিক যখন সত্য খুঁজতে শুরু করেন, তখন তাঁর সামনে শুধু তথ্যের প্রশ্ন থাকে না–থাকে নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বের প্রশ্নও।
এখানে রহস্যের সমাধান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশের প্রক্রিয়াটি। সন্ধ্যা ও বিনোদের যাত্রা তাই কেবল একটি খবরের অনুসন্ধান নয়; ধীরে ধীরে সেটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। একটি খবরের পেছনে থাকা অদৃশ্য শক্তি, স্বার্থের সংঘাত এবং সত্য প্রকাশের পথে বাধা। সব মিলিয়ে ‘রিপোর্টিং লাইভ’ সাংবাদিকতার পেশাগত ঝুঁকিকেও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছে।
নেট ফ্লিক্সে আগামীকাল শুক্রবার মুক্তি পাবে ‘রিপোর্টিং লাইভ’। পরিণীতির নতুন চরিত্র, দেবেন ভোজানির ভিন্নধর্মী উপস্থিতি, অমল পালেকরসহ অভিজ্ঞ শিল্পীদের অভিনয় এবং পরিচালক হিসেবে ধ্রুব ত্রিপাঠীর প্রথম কাজ– সব মিলিয়ে ছবিটি নিয়ে আগ্রহের কারণ কম নয়। শেষ পর্যন্ত সেই আগ্রহ কতটা সার্থক হয়, তার উত্তর মিলবে সন্ধ্যা ও বিনোদের অনুসন্ধান কতটা গভীরে পৌঁছায়, আর তারা সত্যকে কতটা নিরাপদে দর্শকের সামনে আনতে পারেন, সেখানেই।
- বিষয় :
- বিনোদন