ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

যশোর রোড: একাত্তর ও শিল্পীদের মঞ্চযাত্রা

যশোর রোড: একাত্তর ও শিল্পীদের মঞ্চযাত্রা
×
×

নরসিংদীর বাঁধনহারা থিয়েটারের ‘যশোর রোড’ নাটকের দৃশ্য

ফজলুল কবীর তুহিন

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তর শুধু একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, বেদনা, বাস্তুচ্যুতি আর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের এক গভীর ও বেদনাবিধুর অধ্যায়– শরণার্থীদের দুর্বিষহ জীবন। ২ অক্টোবর ছায়ানটের মঞ্চে মঞ্চস্থ ‘যশোর রোড’ গীতালেখ্য সেই মানবিক অধ্যায়টিকে নতুন করে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে।
২৭ ধানমন্ডি–গাই বাংলার গান পর্ষদ আয়োজিত এই গীতালেখ্য পরিবেশন করেছে নরসিংদীর থিয়েটার দল ‘বাঁধনহারা’। দলটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক সংস্কৃতিকর্মীদের একটি সংগঠন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাদের সাংস্কৃতিক চর্চা এই আয়োজনকে দিয়েছে বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য।
তবে এই পরিবেশনার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি ছিল এর শিল্পীবাহিনী। প্রায় ৬০ জন শিল্পী অংশ নিয়েছেন এই আলেখ্যে সাড়ে তিন বছরের শিশু থেকে প্রায় ৭০ বছরের প্রবীণ, তাদের মধ্যে ১৬ জন শিশু এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পী। এত বৈচিত্র্যময় শিল্পীকে একই মঞ্চে একত্র করে একটি সুসংহত পরিবেশনা দাঁড় করানো নিঃসন্দেহে বড় অর্জন।
শিশু শিল্পীদের মঞ্চে উপস্থিতি দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। সাড়ে তিন বছরের শিশুটির উপস্থিতি ছিল একই সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগঘন। শিশুদের দলগত অংশগ্রহণে দর্শক সারিতে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তা পরক্ষণে বদলে গেছে বিষণ্নতায়–যখন সেই নিষ্পাপ মুখগুলোর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ ও শরণার্থী জীবনের নির্মম বাস্তবতা সামনে এসেছে। শিশুদের অভিনয় এখানে শুধু মুগ্ধ করেনি, একাত্তরের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।
একইভাবে প্রবীণ শিল্পীদের উপস্থিতিও দর্শকের মনে আলাদা সাড়া ফেলেছে। প্রায় ৭০ বছর বয়সী শিল্পীদের দৃশ্যগুলোতে অনেক দর্শক যেন ইতিহাসের সঙ্গে আরও সরাসরি সংযোগ অনুভব করেছেন। তাদের কণ্ঠ, উপস্থিতি ও অভিব্যক্তি পরিবেশনায় এমন একটি বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছে, যা কেবল অভিনয়ের দক্ষতা দিয়ে তৈরি করা কঠিন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পীর অংশগ্রহণ ছিল পরিবেশনার অন্যতম স্মরণীয় দিক। দর্শকের কাছে এটি নিছক ‘অন্তর্ভুক্তি’র উদাহরণ হয়ে থাকেনি; বরং তাঁর শিল্পীসত্তা ও মঞ্চে স্বাভাবিক অংশগ্রহণ হয়ে উঠেছে মূল বিষয়। তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছ থেকে বিশেষ মনোযোগ ও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এই পরিবেশনার দর্শক প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক ছিল নীরবতা। সব করতালি যে প্রশংসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ–‘যশোর রোড’ যেন তার বিপরীত একটি সত্যও দেখিয়েছে। শরণার্থীদের দুর্দশা, ঘর হারানোর বেদনা কিংবা মৃত্যুর দৃশ্যগুলোর সময় মিলনায়তনের নীরবতা ছিল অনেক বেশি অর্থবহ। দর্শক তখন হাততালি দিচ্ছিলেন না; মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন, শুনছিলেন এবং অনুভব করছিলেন।
বিশেষ করে গান ও কবিতার আবেগঘন অংশগুলোতে দর্শকের মধ্যে গভীর মনোযোগ দেখা গেছে। পরিবেশনার শেষে সেই চাপা আবেগ পরিণত হয়েছে দীর্ঘ করতালিতে। শিশু শিল্পীদের অভিনয়, প্রবীণ শিল্পীদের উপস্থিতি এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পীর অংশগ্রহণ–এই তিনটি বিষয় দর্শকদের আলোচনায়ও বিশেষভাবে এসেছে। দর্শক প্রতিক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল ‘যশোর রোড’কে নতুন করে আবিষ্কার করা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের প্রচলিত আলোচনায় যুদ্ধ, বিজয়, বঙ্গবন্ধু, গণহত্যা কিংবা রাজনৈতিক ইতিহাসের বিষয়গুলো সামনে থাকলেও শরণার্থীদের দীর্ঘ যাত্রা ও মানবিক দুর্ভোগের গল্প তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। এই গীতালেখ্য দেখে দর্শক অনেকে সেই অজানা বা কম আলোচিত ইতিহাসের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ পেয়েছেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, দর্শক শুধু অভিনয় দেখেননি; তারা শিল্পীদের সংগ্রামটিও অনুভব করেছেন। কারণ মঞ্চে যারা ছিলেন, তাদের অনেকে পেশাদার অভিনয়শিল্পী নন; তারা প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত সংস্কৃতিকর্মী। বড় মঞ্চ, সীমিত সম্পদ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের প্রায় ৬০ জনের দলগত পরিবেশনা দর্শকের কাছে একটি আলাদা সম্মান তৈরি করেছে।
এই জায়গায় ‘বাঁধনহারা’র প্রয়াসকে আলাদাভাবে দেখতে হয়। একদিকে তারা একাত্তরের ঘরহারা মানুষের গল্প বলেছে, অন্যদিকে নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা নিয়েও মঞ্চে দাঁড়িয়েছে। ফলে বঞ্চিত মানুষের ইতিহাস বলেছে বঞ্চিত মানুষরাই–এই বিষয়টি পুরো আয়োজনের ভেতরে একটি গভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তৈরি করেছে।
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শেষ হওয়ার পর দর্শকের করতালি তাই শুধু একটি নাট্যপ্রযোজনার জন্য ছিল না; এর মধ্যে ছিল শিল্পীর শ্রমের স্বীকৃতি, শিশু ও প্রবীণ শিল্পীদের প্রতি মুগ্ধতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পীর সাহসী অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সর্বোপরি একাত্তরের শরণার্থী মানুষের বেদনার প্রতি সম্মান।
এই আয়োজনের সাফল্যের পেছনে নির্দেশক কামরুজ্জামান তাপুর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। প্রায় ৬০ জন শিল্পীকে নিয়ে একটি গীতালেখ্য নির্মাণ, যেখানে সাড়ে তিন বছরের শিশু থেকে প্রায় ৭০ বছরের প্রবীণ, ১৬ জন শিশু এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিল্পী রয়েছেন– এমন একটি বৈচিত্র্যময় দলকে একই ছন্দে মঞ্চে দাঁড় করানো সহজ কাজ নয়।
তাপুর নির্দেশনার বড় কৃতিত্ব এখানেই–তিনি শিল্পীদের সীমাবদ্ধতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি; বরং তাদের বৈচিত্র্যকেই পরিবেশনার শক্তিতে পরিণত করেছেন। শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ততা, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিল্পীর উপস্থিতিকে একই নাট্যভাষার মধ্যে এনে তিনি একটি সম্মিলিত মঞ্চচিত্র তৈরি করেছেন।
এই কারণে ২ অক্টোবর ছায়ানটের মঞ্চে ‘যশোর রোড’ শুধু অভিনীত হয়নি–দর্শকের অনুভূতির মধ্যেও কিছুটা পথ হেঁটে গেছে। 
লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্য সংগঠক 

আরও পড়ুন

×