পৃথিবী বাঁচাতে তারকাদের মৃত্যুফাঁদ!
স্যাক্রিফাইস সিনেমার দৃশ্য
রহমান লেনিন
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? গাছ লাগিয়ে, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে, নাকি কয়েকজন হলিউড তারকাকে আগ্নেয়গিরিতে ছুড়ে ফেলে? শেষের কথাটি শুনে আপনার হাসি পেতে পারে। ফরাসি পরিচালক রোমাঁ গাভরাসের ‘স্যাক্রিফাইস’ সিনেমার গল্প এগিয়েছে ঠিক এমনই এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর ঘটনাকে ঘিরে। পরিবেশ রক্ষার কথা বলতে এক অনুষ্ঠানে জড়ো হন ধনকুবের ও তারকারা। তাদেরই কয়েকজনকে হত্যা করে পৃথিবী বাঁচানোর পরিকল্পনা করে একটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠী। শেষ পর্যন্ত পৃথিবী রক্ষার এ আয়োজন মানুষের বিবেকের পরীক্ষায় পরিণত হয়।
২০২৫ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ প্রদর্শনী বিভাগে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। সিনেমাটি পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য লিখেছেন রোমাঁ গাভরাস ও উইল আরবেরি। অভিনয় করেছেন ক্রিস ইভান্স, আনিয়া টেলর-জয়, ভিনসেন্ট ক্যাসল, জন মালকোভিচ, সালমা হায়েক ও স্যাম রিচার্ডসন। আছেন সংগীতশিল্পী চার্লি এক্সসিএক্সও। নেটফ্লিক্সের ঘোষণা অনুযায়ী, আমেরিকা ও ফ্রান্সে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাবে আগামীকাল ১৬ অক্টোবর।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাইক টাইলারের অভিনয় করেছেন ক্রিস ইভান্স। তিনি হলিউডের একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা। তাঁর ক্যারিয়ার এখন ভালো সময় পার করছে না। পেশাগত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি জনসমক্ষে নিজের ভাবমূর্তি নিয়েও তাঁকে সংকটে পড়তে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মাইক এমন একটি সুযোগ খুঁজছেন, যার মাধ্যমে নিজের অবস্থান ফিরে পাওয়া এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। সে লক্ষ্যে তিনি গ্রিসে আয়োজিত একটি বিলাসবহুল পরিবেশবিষয়ক দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
অনুষ্ঠানটিতে জড়ো হন ধনকুবের, চলচ্চিত্র তারকা ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। পরিবেশ রক্ষা, মানবকল্যাণ এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সেখানে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চারদিকে আভিজাত্য, ক্যামেরা আর প্রচারের আয়োজন। মাইকও এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ দেখতে পান। তবে গল্পের শুরু থেকে প্রশ্ন ওঠে–এই আয়োজনের পেছনে পরিবেশ রক্ষার আন্তরিকতা কতটা আর নিজেদের পরিচিতি ও সুনাম বাড়ানোর চেষ্টা কতটা? মাইকের চরিত্রের মধ্য দিয়ে সিনেমাটি হলিউডের তারকাখ্যাতি, জনসমক্ষে নিজেকে উপস্থাপন এবং ব্যক্তিস্বার্থের সম্পর্কও তুলে ধরে। কারণ প্রশ্ন থেকে যায়, এ আয়োজনের উদ্দেশ্য সত্যিই পৃথিবীকে বাঁচানো, নাকি নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা?
কিন্তু মাইকের পরিকল্পনা দ্রুত ভেস্তে যায়। আনিয়া টেলর-জয়ের অভিনীত জোয়ানের নেতৃত্বে একটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠী অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে অতিথিদের জিম্মি করে ফেলে। তাদের দাবি, মানবসভ্যতাকে আসন্ন বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে তিনজন মানুষকে আগ্নেয়গিরিতে উৎসর্গ করতে হবে। ফলে নিজের ক্যারিয়ার ও ভাবমূর্তি নিয়ে ব্যস্ত মাইক হঠাৎ এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে পড়েন, যেখানে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় নিজের জীবন বাঁচানো। যে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি নতুন করে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেতে চেয়েছিলেন, সেই অনুষ্ঠানই তাঁকে ঠেলে দেয় জীবন-মৃত্যুর ভয়ংকর সংকটে। পরিবেশ রক্ষার অনুষ্ঠানে এসে তারকারা নিজেরাই যে দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠবেন–এমন কথা নিশ্চয়ই তাদের আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল না।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সমালোচক বেঞ্জামিন লি চলচ্চিত্রের শুরুর অংশে তারকাদের আত্মপ্রচার এবং পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরির প্রবণতা নিয়ে করা ব্যঙ্গের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, পরের দিকে গল্পের গতি কমে যায় এবং ফলে
কাহিনির সংযোগও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সিনেমায় তারকাবহুল অভিনয়শিল্পীর মধ্যে রয়েছেন মেক্সিকান অভিনেত্রী সালমা হায়েক। তিনি অভিনয় করেছেন গ্লোরিয়া ব্র্যাকেন চরিত্রে। তাঁর স্বামী ধনকুবের বেন ব্র্যাকেনের ভূমিকায় আছেন ভিনসেন্ট ক্যাসল (আসল নাম ভিনসেন্ট ক্রোশঁ)। সালমার চরিত্রটি এ সিনেমার গল্পের ধনী ও প্রভাবশালী মানুষের জগৎকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তবে গল্পের মূল দ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছে ক্রিস ইভান্স ও আনিয়া টেলর-জয়ের চরিত্রকে ঘিরে।
সালমা হায়েক এর আগে ‘ফ্রিদা’, ‘ডেসপেরাডো’ ও ‘বিয়াত্রিজ অ্যাট ডিনার’-এর মতো ভিন্নধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০২৩ সালে ‘ম্যাজিক মাইকস লাস্ট ড্যান্স’ এবং ২০২৪ সালে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি পরিচালিত ‘উইদাউট ব্লাড’-এ তাঁকে দেখা গেছে।
এই সিনেমা হলিউডে নারী তারকাদের বয়স, জনপ্রিয়তা এবং তাদের জন্য তৈরি চরিত্রের ধরন নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা অবশ্য সিনেমাটি দেখার পরই বোঝা যাবে।
‘স্যাক্রিফাইস’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে পরিবেশ রক্ষার নামে চলা দুই ধরনের কর্মকাণ্ডকে পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে ধনকুবের ও তারকারা নিজেদের ভাবমূর্তি ভালো রাখতে পরিবেশ রক্ষার কথা বলেন। অন্যদিকে উগ্রপন্থিরা মানবতার ভবিষ্যৎ বাঁচানোর অজুহাতে মানুষ হত্যার পরিকল্পনা করে। এক পক্ষের হাতে অর্থ ও প্রচার, অন্য পক্ষের হাতে অন্ধ বিশ্বাস ও সহিংসতা। প্রশ্ন হলো–মানুষের জীবন ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে?
নেটফ্লিক্সের ‘টুডাম’-এ দেওয়া এক বক্তব্যে পরিচালক গাভরাস জানিয়েছেন, গ্রিক পুরাণ, জোয়ান অব আর্কের কিংবদন্তি এবং ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। অন্যদিকে ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’-এর সমালোচক অ্যাডাম নাইম্যান সিনেমার অতিরিক্ত দৃশ্যনির্ভর শৈলী এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের অসংগতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সব মিলিয়ে ‘স্যাক্রিফাইস’ এমন একটি সিনেমা, যেখানে পৃথিবীকে বাঁচানোর কথা আর নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা মুখোমুখি দাঁড়ায়। পরিবেশ রক্ষার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া তারকারাই হয়ে ওঠেন দাবার ঘুঁটির সম্ভাব্য শিকার। দর্শকের সামনে তাই একটি প্রশ্ন থেকে যায়–পৃথিবীকে বাঁচাতে কি সত্যিই মানুষের জীবন উৎসর্গ করতে হবে, নাকি বদলাতে হবে সেই মানসিকতা, যা পৃথিবীকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে হলিউডের ঝলমলে তারকাদের আগ্নেয়গিরির কিনারায় দাঁড় করিয়ে পৃথিবী বাঁচানোর এমন অদ্ভুত গল্প দর্শকের কৌতূহল জাগাতেও পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সাইট অ্যান্ড সাউন্ড, নেটফ্লিক্স টুডাম
- বিষয় :
- সিনেমা