পায়ের তলায় শর্ষে
দেশ-দেশান্তরে এই আমি
পূজা সেনগুপ্ত
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভ্রমণ একদিকে যেমন অনুভব আর স্মৃতিকোষে হাজারো দৃশ্যের সঞ্চয়, তেমনি সৌন্দর্যের হাতছানিতে জড়তা ভেঙে মুক্ত ডানায় উড়াল দেওয়ার। এভাবেই কখনও পড়াশোনার কিংবা কাজের সূত্রে, নয়তো কেবলই ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছি পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত দুই ডজন বেশি দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এর মধ্যে কীভাবে জানি না, এশিয়া আর ইউরোপের দেশগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। এশিয়ার ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, স্পেন আরও কয়েকটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। যার প্রতিটি সফরই ছিল রোমাঞ্চকর। ভূপ্রকৃতি, স্থাপত্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে শুরু করে নানা দিক মিলিয়ে প্রতিটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরকে আবিষ্কার করেছি নানা রূপে। এ কথা সত্যি যে, প্রতিটি দেশের আলাদা সৌন্দর্য আছে, যা কখনও পরিমাপ করা যায় না। প্রথম যেবার দেশের বাইরে ভ্রমণে গেলাম, তখন আমি খুব ছোট। দল বেঁধে জামার্নিতে যাব–এটা ভেবেই দীর্ঘ সময় ভালো লাগায় বিভোর ছিলাম। এরপর এলো কাঙ্ক্ষিত সেই দিন, যেদিন যান্ত্রিক উড়াল পাখির ডানায় ভর করে জার্মানির উদ্দেশে ঘর ছাড়লাম। তখনও ভাবিনি, জার্মানির আগেই অন্য একটি দেশে পায়ের ধুলো পড়বে আমার। এটি হয়েছিল ট্রানজিটের কারণে। সে সময় সরাসরি জার্মানিতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ট্রানজিট নিয়ে সেখানে যেতে হতো। যে কারণে একদিন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত শহর দুবাইয়ে থাকতে হয়েছিল। এভাবে প্রথম যে দেশটিতে আমার পায়ের ধুলো পড়েছে, সেটি জার্মানির বদলে হয়ে গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিস্ময়করভাবে অন্য একটি দেশে পা রাখার অভিজ্ঞতার কারণে হয়তো প্রথম বিদেশ সফর আজও স্মৃতিতে অম্লান। তাইতো আজও চোখে ভাসে, কীভাবে আমরা দশজন দল বেঁধে উঠে পড়েছিলাম উড়োজাহাজে। জার্মানির উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পর মিষ্টি চেহারার বিমানবালারা এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের দিকে। মজাদার চকলেট হাতে তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে ভ্রমণের পুরোটা সময় যে ভালোবাসায় আগলে রেখেছিলেন, তা কখনও ভুলবার নয়।
অনেক দেশ তো ঘুরলাম, মুগ্ধতা নিয়ে মনের পর্দায় এঁকে গেলাম হাজারো দৃশ্য। তবু বিশ্বভ্রমণের তৃষ্ণা রয়ে গেল। এজন্য হয়তো কিছু শহর বারবার আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে; যার মধ্যে আসার আগে আসে কলকাতার নাম। কেন? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার উপলব্ধি এটাই– মানুষ যেখানে পড়াশোনা করে, সে জায়গার সঙ্গে আলাদা একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। যেহেতু আমি কলকাতায় পড়াশোনা করেছি, সেই সূত্রে এই শহরের প্রতি ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কলকাতা একদিকে যেমন সাদামাটা, ব্রিটিশ কলোনিয়াল সময়ে রাজধানী থাকায় পুরোনো স্থাপত্যের ক্ষত চিহ্ন যেমন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে, তেমনি আধুনিকতার প্রলেপ মেখে হয়ে উঠেছে নতুনতর। ইতিহাস-ঐতিহ্য, আধুনিকতা সবকিছু মিশে একাকার হয়ে গেছে কলকাতায়। তাই এ শহর পুরোনো হয়েও পুরোনো নয়, নতুন ভাবধারাতেও অতীত বিস্মৃত নয়। তাইতো কথাশিল্পীদের মতো করেই বলতে হয়, কলকাতা আছে শুধু কলকাতাতেই।
কলকাতার মতো আমাকে আরও যে কটি শহর হাতছানি দিয়ে ডাকে, তার মধ্যে শিল্প ও কবিতার শহর প্যারিস অন্যতম। একইভাবে ম্যানিলার কথা বলতে হয়। এই শহরের যে প্রান্তেই যাই, দেখা মেলে সমুদ্রের। এটি ম্যানিলা ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। শুধু বিদেশ নয়, নিজের দেশের প্রতিও আছে অমোঘ আকর্ষণ। বিশেষ করে কক্সবাজার দারুণ ভালো লাগে। মাথার ওপর বিশাল আকাশ নিয়ে পাহাড় আর সমুদ্রের দেখা কেবল সেখানেই মেলে। আসলে বিশালতার কাছে গেলে নিজের ক্ষুদ্রতাকে আবিষ্কার করা যায়। মুছে ফেলা যায় সমস্ত অহংকার। তাই সুযোগ পেলেই ছুট দিতে চাই কক্সবাজার। ঠিক ছোটবেলায় যেমন গ্রীষ্ম বা শীতে যেভাবে চট্টগ্রামে ছুটে যেতাম, তেমনই এক ভালো লাগা মনের মধ্যে কাজ করে। চট্টগ্রামের মেহেদিবাগের দাদু-দিদার বাড়িটা ছিল সবচেয়ে প্রিয়। শহরের মাঝখানে প্রাকৃতিক নৈসর্গে ঘেরা সেই বাড়ির উঠোন আর বাগানে ছুটে বেড়ানো আর সবার আদর স্নেহ ভালোবাসা ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত, যা আজও স্মৃতির ক্যানভাসে নানা রঙে আঁকা হয়ে আছে।
- বিষয় :
- বিনোদন