মানব পাচার
দুষ্টচক্র দমন করুন
নিহত মো. নূরুল হুদা চুট্টু
--
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৪
মানব পাচারের শিকার হয়ে গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সেন্টমার্টিনের কাছে সমুদ্রে ট্রলারডুবির ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সমকালে 'মানব পাচারের জাল' শীর্ষক পাঁচ পর্বে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদন সোমবার শেষ হয়। প্রতিবেদনগুলোতে গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সারাদেশে ৪৭০ জনের মানব পাচার চক্রের কথা বলা হয়েছে। যেখানে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কক্সবাজার। আমরা দেখেছি, এ দুষ্টচক্রের তালিকায় পুলিশ-সিভিল এভিয়েশন কর্মীও রয়েছেন। এমনকি রয়েছেন জেলা পরিষদ সদস্যও। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে দুষ্টচক্রে প্রবাসীরাও কম যাননি। এভাবে গোটা দেশেই বিস্তৃত মানব পাচারের নেটওয়ার্ক। যে চক্রের খপ্পরে পরে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেকে। কারও সাগরে সলিলসমাধি ঘটেছে। শুধু সেন্টমার্টিন কিংবা দেশের সমুদ্র এলাকায় নয়, বিভিন্ন সময় লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার পথেও একাধিক নৌকাডুবির ঘটনায় বাংলাদেশিরা মারা গেছে।
থাইল্যান্ডের জঙ্গল কিংবা মালয়েশিয়ার গণকবরেও সাগরপথে যাওয়া বাংলাদেশি কারও স্থান হওয়া বিচিত্র নয়। মানব পাচার চক্রে সমাজের 'গণ্যমান্য'দেরও যে আমরা দেখছি, সেটি দুর্ভাগ্যজনক। জনপ্রতিনিধি এমনকি নারীও কীভাবে এ চক্রের সঙ্গে হাত মেলান? তারা টার্গেট করেন যারা একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখতে বিদেশ যেতে চায়। তাদেরকে সমুদ্রে ট্রলার কিংবা নৌকায় চড়িয়ে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। মরণবাধা পেরিয়ে যারা সংশ্নিষ্ট দেশে পৌঁছে, তারা কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কাজ পায় না। কাউকে দিয়ে শ্রমসাধ্য কাজ করানো হয়। কেউ আবার বাধ্য হয়ে যৌনদাসী হিসেবে আটকা পড়েন। সারাদেশে পাচারচক্রের অনেক সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের নাম সমকালের প্রতিবেদনগুলোতে এসেছে। এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে কক্সবাজার এ কারণে যে, সেখানে রোহিঙ্গা শিবির অবস্থিত। রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের পাচারে কক্সবাজারকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ চক্র চাকরি দেওয়ার নামে কিংবা বিয়ের উদ্দেশ্যে তাদেরকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় 'বিক্রি' করে দিচ্ছে। আমরা দেখেছি, গত সপ্তাহে সেন্টমার্টিনের ট্রলার দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যকই ছিল রোহিঙ্গা। এ পাচার বন্ধে রোহিঙ্গাদের প্রতি যেমন বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে, একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের পাচারচক্রের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। মানব পাচারচক্রের পরিচয় এখন সামনে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে।
অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রয়োজন। আমরা বিস্মিত যে, পাচারকারীদের নামে মামলা হলেও বিচার হয়নি। বিচার না হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনোভাবেই তাদের ছাড় দেওয়া যাবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, মানব পাচারবিরোধী আইন হলেও তার প্রয়োগ আমরা দেখিনি। ২০১২ সালে জারি করা ওই আইনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হলেও এখনও সেটি গঠন করা হয়নি। ফলে মানব পাচারও থেমে নেই। মানব পাচারের নামে 'আধুনিক দাসত্ব' আর চলতে দেওয়া যায় না। মানুষের জীবন নিয়ে যে দুষ্টচক্র খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের আর বাড়তে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সার্বিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেকারদের প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।
- বিষয় :
- মানব পাচার
- দুষ্টচক্র
