ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

শিক্ষা খাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক

শিক্ষা খাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক
×

.

মো. মাহবুবুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:২১

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন খাতের মূল্যায়ন সামনে আসছে। তারই আলোকে শিক্ষা খাত নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ সরকারের প্রথম দিকে বর্তমান পরিকল্পনা উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, শিক্ষক নেতা ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের দীর্ঘ দিনের সংকট, বৈষম্য, অদক্ষ নীতিমালা, এমপিও জটিলতা এবং বেসরকারি শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের বিষয় সরাসরি শুনেছেন ও উপলব্ধি করেছেন। তারই আলোকে বিশেষত বেসরকারি শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও বৈষম্য দূরীকরণে নেওয়া হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অর্থ উপদেষ্টাও সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন। 

বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারও শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। এমন একটি সম্মানজনক ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো তৈরির কথা তিনি বলেছেন, যাতে মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতায় আসতে উৎসাহিত ও আকৃষ্ট হয়। কিন্তু সমস্যার মূলে রয়েছে বাস্তবায়নের সেই পুরোনো দীর্ঘসূত্রতা। এই প্রশাসনিক জটিলতা শিক্ষা খাতের স্বপ্ন ব্যর্থ করে দিচ্ছে। বাস্তবায়নের এই স্থবিরতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি নীতিমালার জটিলতা। বছরের পর বছর একক, স্বচ্ছ নীতিমালা দাবি করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সদ্য ঘোষিত সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার পৃথক নীতিমালা মাঠ পর্যায়ে নতুন বিভ্রান্তি, বৈষম্য ও হয়রানি তৈরি করেছে। ফলে শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ বাড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনুরূপভাবে পরিকল্পনা কমিশনের বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট সবই থাকলেও নেই সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দক্ষ বাস্তবায়ন।

অন্যদিকে যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে, সেই আমলারা প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দেই বেশি আগ্রহী। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বছরের শেষ দিকে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচে চাপ থাকায় নামমাত্র কিছু প্রশিক্ষণের আয়োজন হয়, যেখানে শিক্ষকদের ডেকে ডেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। শুধু টাকা খরচ। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ঘটে না। সে কারণে পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দক্ষ বাস্তবায়ন ও বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার। কেবল খসড়া তৈরি নয়; বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যেন না পড়ে স্থবিরতার জট।
শিক্ষা খাতে একটি সিদ্ধান্ত কেবল শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সিদ্ধান্তহীনতা দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষকদের মনোবল, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের আগ্রহ এবং মানসিক সুস্থতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে তারা হতাশায় ভোগেন, শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে।

নীতিনির্ধারকদের উচিত শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নকে শিক্ষানীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ তারাই জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সিদ্ধান্তহীনতা, আমলাতান্ত্রিক জট এবং অদক্ষ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চাই সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, শুরুতেই শিক্ষকদের বদলি নীতিমালার প্রক্রিয়াকে সর্বজনীন, স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত ও সময়সীমা নির্ধারণ করে সম্পন্ন করতে হবে। তা ছাড়া প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ যেমন অপ্রয়োজনীয় মিটিং, সিটিং অ্যালাউন্স বা নামমাত্র প্রশিক্ষণে অপচয় না হয়ে সরাসরি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ব্যয় হয়, তা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী বাস্তবায়ন তদারকি সেল গঠন করতে হবে, যারা পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করবেন।

সুশাসন ও জবাবদিহি ছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ও প্রকল্প সফলতা পাবে না। বরং তা জনগণের করের অর্থের অপচয় হয়ে দাঁড়াবে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমানতা। কারণ আজকের একটু বিলম্ব আগামী প্রজন্মকে মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। শিক্ষক সমাজ মনে করে, তাদের আগে পেটের ক্ষুধা মেটানোর ব্যবস্থা না রেখে শুধু প্রশিক্ষণের ফরমান দিয়ে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো, জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া প্রশিক্ষণ শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। 
বাংলাদেশের উন্নয়নে শিক্ষকদের জীবনমান নিশ্চিত করাই হবে প্রথম ও প্রধান শর্ত। কারণ জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষকদের অবহেলিত করে রাখা কোনো সমাধান নয়। আমরা চাই, অন্তর্বর্তী সরকারের বাকি দিনগুলোতে শিক্ষকদের জন্য নেওয়া পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হোক।

মো. মাহবুবুর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×