অধিকার
ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেদের টিকে থাকার লড়াই
.
খায়রন্নেসা সরকার
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৪১
আমরা অনেক সময় ‘জেলে’ ও ‘মৎস্যজীবী’ পেশাকে মিলিয়ে ফেলি। বাস্তবে জেলেরা নদী, খাল, বিল তথা উন্মুক্ত জলাশয়ের প্রাকৃতিক মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। আর মৎস্যজীবীরা যুক্ত মাছ চাষের সঙ্গে। দেশে মৎস্য খাতের উন্নয়নে মৎস্য চাষকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়; জেলেদের নয়।
দেশের প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের উজানের জেলেরা আরও বেশি প্রান্তিক। ইলিশের প্রাচুর্য না থাকায় তাদের দুর্দশা নিয়ে সরকার কিংবা বেসরকারি মহলেও মনোযোগ কম। যদিও শুধু কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত জেলে আছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা পায়, বাকি ৬৫ শতাংশ বঞ্চিত।
দেশের তথাকথিত উন্নয়ন ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেদের স্পর্শ করতে পারেনি। উপরন্তু বর্তমানে নদীতে মাছস্বল্পতা দেখা দিয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির মতো ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেপল্লিতে আজও সেই জবুথবু ঘর, টিনের ছাউনি, পরনে ছিন্ন বস্ত্র, শরীরে আজন্ম পুষ্টিহীনতার ছাপ, রোদে পোড়া কালশিটে চেহারা, অশিক্ষা, ক্ষুধা। এই জেলায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা জাল কর্মসূচি থাকলেও শতভাগ জেলে পরিবার এনজিওর ঋণের জালে বন্দি।
কয়েক বছর ধরে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে যেসব সমস্যা পেয়েছি, তার মধ্যে রয়েছে– ১. ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা ভিন্ন পেশার মানুষের নদীতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, দখলদারিত্ব ও ফিশারম্যান আইডি কার্ডে অন্তর্ভুক্তি। ২. মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা সংরক্ষণে যথাযথ সহায়তা ছাড়াই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় ঋণের জাল। ৩. চায়না জাল বা রিং জালসহ মাছ ধরার ক্ষতিকর উপকরণের উৎস বন্ধ না করে প্রান্তিক জেলের প্রশাসনিক হয়রানি। ৬. মৎস্য খাতে নারীর শ্রমকে অস্বীকৃতি।
এসব সমস্যার মূল কারণ জেলেদের সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব। দারিদ্র্যের কারণে জেলে পরিবারের সদস্যকে ১৮ বছরের আগেই জীবিকার দায়িত্ব নিতে হয়; কিন্তু মৎস্য আইনে ফিশারম্যান আইডি কার্ড পেতে এনআইডি কার্ড প্রয়োজন। সম্প্রদায়গত জেলের মাছ ধরার অধিকার আইনে সুরক্ষিত না থাকায় নদীতে তাদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত। উপরন্তু বছরে যে কয়েক মাস জাটকা ও মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলে, তখন অন্যান্য মাছ ধরতে গিয়েও জেলেরা জাল পোড়ানোসহ নানা হয়রানির শিকার হয়।
কর্মসূচি চলাকালে ২২ দিনের জন্য একটি জেলে পরিবারকে সরকার ২০ কেজি চাল সহায়তা দেয়। সেটাও বাড়িতে নেওয়ার পর ১৫-১৭ কেজিতে নামে। ২০ কেজি ধরে নিলেও এই পরিমাণ চাল ৫-৬ জনের পরিবার সর্বোচ্চ ১০ দিন চলতে পারে। আর জেলে পরিবারের পাতে কি শুধু ভাতই প্রয়োজন? তার ওপর আছে স্কুলগামী শিশুর খাতা-কলম, সাবান-শ্যাম্পু, ওষুধপত্র ও ঋণের কিস্তি চালানোর দায়। এটুকু প্রণোদনার ঢাক পিটিয়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও তা থেকে বঞ্চিত হয় কুড়িগ্রাম জেলার নিবন্ধিত জেলের ৬৫ শতাংশ।
দেখা যায়, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এ সময়ে জেলেপল্লির শতভাগ পরিবারের নারী ঋণ নেয় এনজিও থেকে। বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধে পুনরায় ঋণ করে। এভাবে ঋণচক্র আবর্তিত হতে থাকে।
বংশপরম্পরায় উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা নদীর মাছ ধ্বংস হোক, তা চায় না। কারণ নদী ও মাছের সঙ্গে তার সম্পর্ক জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির।
জেলের সঙ্গে শুধু জল নয়; জালেরও সম্পর্ক নিবিড়। আগে যেসব প্রথাগত জাল ব্যবহার করা হতো; দলবদ্ধতা ও দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। রাত জেগে লেগে থেকে মাছ ধরতে হতো। তাই প্রথাগত জেলেদের বাইরে অন্যদের আগ্রহ ছিল কম। কিন্তু চায়না দুয়ারীর মতো জালের সহজলভ্যতায় ও দক্ষতা প্রয়োজন না হওয়ায় এখন জেলের জায়গা দখল করে নিয়েছে ভিন্ন পেশার লোকজন। জলজ জীববৈচিত্র্যের হন্তারক এই চায়না দুয়ারী জাল সরকারি বিধানে অবৈধ হলেও উৎপাদন, বিপণন কেন্দ্র পেরিয়ে নদীতে সয়লাব।
চায়না দুয়ারী জালের প্রধান ক্রেতা শৌখিন মৎস্য শিকারিরা। তারা অন্য কাজের পাশাপাশি মাছ ধরে; আর্থিক সংগতি থাকায় একেকজন ৩০-৪০টি জাল নদীতে ফেলে রাখে। তাদের নামেই রয়েছে কারেন্ট শক, গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহারের অভিযোগ। তাদের অনেকে এখন ‘নিবন্ধিত জেলে’; প্রথাগত জেলেরা পেশাছাড়া হচ্ছে।
একজন জেলে বলেছিলেন, আজ পোনা মাছটা নষ্ট হলে জেলের আগামীকালের খাবারটা থাকে না। তাই জেলেরা কখনও পোনা বা ডিম নষ্টকারী উপকরণ বা পদ্ধতি ব্যবহার করে না। বস্তুত নদী, মাছ, জেলে পরস্পর সহায়ক। নদীকে দখল-দূষণমুক্ত রাখতে এবং প্রাকৃতিক মাছের প্রাচুর্য অব্যাহত রাখতে জেলের পেশাগত সুরক্ষা জরুরি। জেলে জীবনের দুর্দশার জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে সরকারের দায়িত্বহীনতা আড়াল করা যাবে না।
খায়রন্নেসা সরকার: পরিবেশকর্মী
- বিষয় :
- অধিকার
- জেলে
- ব্রহ্মপুত্র
- মৎস্যজীবী
