ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দিবস

প্রবীণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতখানি প্রস্তুত? 

প্রবীণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতখানি প্রস্তুত? 
×

ফাইল ছবি

মিতালী হোসেন 

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:১৮

অনেক দিন আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটা বিজ্ঞাপন দেখতাম, ‘আপনি কি বিষণ্ণতা রোগে ভুগছেন? সিবাগেইগি?’ একটা রকিং চেয়ার দুলছে। এই বিজ্ঞাপনটার মেকিং আমার খুব ভালো লাগত। কিন্তু বিষয়বস্তু বুঝতে পারতাম না। বিষণ্ণতায় ভোগা আবার কী? জন্ম থেকে কত প্রবীণ মানুষকেই তো দেখেছি চারপাশে। কই তারা সারাক্ষণ মন খারাপ করে আছে বলে তো মনে হয়নি।

বহুদিন পর যখন কাজ করতে শুরু করলাম, তখন মনে হতো– নাহ্‌ ওরা মন খারাপ করে থাকত। সেই সব মানুষের আচরণকে রিলেট করেছি। আমার দাদি-নানি, সোলেমান কাকা, ভেবুলি দাদি,  ছৈতুনি ফুফু এরা ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষ ছিল। কিন্তু সবাই বিষণ্ণ ছিল, একা ছিল। অবহেলিত ছিল। সংসারের একপাশে পড়ে ছিল পুরোনো দামি তৈজসপত্রের মতো। যার সংসার ছিল সেও একা ছিল। যার সংসার ছিল না, সেও একা ছিল। ওরা সবাই অসহায় ছিল। আমার দাদি বিত্তশালী ছিলেন। কিন্তু একাকিত্ব ছিল। দাদির ব্যক্তিগত সহকারী ছৈয়তনি ফুফুর কি শুধুই তিন বেলার খাবার আর পরনের কাপড়ই লাগত। আর কিছু কি লাগত না?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ধীরে ধীরে জীবনের কেন্দ্র থেকে সরে যায়। অবসর, একাকিত্ব, অসুখ-বিসুখ সব মিলিয়ে প্রবীণরা প্রায়শই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন। বয়স বাড়ে দেহের। অথচ মনের মধ্যকার কিশোর বা যুবকটি তখনও অগুনতি স্বপ্ন দেখে। ভালোবাসা আর আবেগে ভরপুর হৃদয়। কিন্তু সেই ভালোবাসা, আবেগ, স্বপ্ন সে প্রকাশ করতে পারে না। সন্তানরা নিজের নিজের জগতে ব্যস্ত। সমাজে সে অপ্রাসঙ্গিক। তখন নিঃসঙ্গতা তো এসে জড়িয়ে ধরে। মনের কষ্ট বাড়ে।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অনেক পরিবর্তন আসে। যা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু অনেকের পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া সহজ হয় না। যা তাকে বিষণ্ণ করে তুলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষ উভয়েরই যৌন ইচ্ছা ও সক্ষমতা কমতে থাকে। অনেকে এই পরিবর্তনটাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। অনেক প্রবীণ এই পরিবর্তনের ফলে নিজেকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। যার ফলে হতাশা ও বিষণ্ণতা ভর করে। এর ফলে যে মানসিক পরিবর্তন হয়, তা থেকেও হতে পারে একাকিত্ব বোধ। 

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে নানা রকম পরিবর্তন হয়। অসার, দুর্বলতা, সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব, সামাজিক উপেক্ষা প্রবীণদের মধ্যে বিষণ্ণতা জন্ম দেয়। আপনার বাড়িতে প্রবীণ ব্যক্তিটি বিষণ্ণতায় ভুগছেন কিনা, তা সব সময় চুপচাপ থাকা। কথা না বলা। খাবারে অনীহা। কোনো বিষয়ে আগ্রহ না থাকা। মৃত্যু চিন্তা। নিজেকে আড়াল করে রাখা এবং অতিরিক্ত ঘুম বা অনিদ্রা। এসব লক্ষণের সবই হয়তো সবার মধ্যে থাকে না। কিন্তু এর একটা দুটি লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন সমস্যা আছে, এই সমস্যার সমাধান কী? সমাধান পুরোপুরি সম্ভব কিনা জানি না, তবে চেষ্টা তো করাই যায়।

পরিবার– আজকের এই ভঙ্গুর সমাজ ও পারিবারিক অবস্থায় আমরা পারিবারিক সাপোর্ট কতটা আশা করতে পারি। কতটা আশা করা উচিত। এই ইঁদুর দৌড়ের যুগে ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই ব্যস্ত। তাই খুব বেশি আশা করা যেমন ঠিক না, তেমনি পরিবারের সদস্যদেরও উচিত যতটা সম্ভব সময় দেওয়া, কথা বলা, কথা শোনা। সামাজিক সম্পৃক্ততা, ধর্মীয় উপাসনালয়ে যাওয়া, ধর্ম-কর্মে মন দেওয়া। আধ্যাত্মিকতার চর্চা করা, ক্লাব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা কোনো সেবামূলক কাজের করার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। যা প্রবীণ জীবনকে অনেকটা সহজ করতে পারে।
শখ– হবি মানে শখের চর্চা করা। বই পড়া, সিনেমা দেখা, বাগান করা এ রকম যে কোনো শখের চর্চা করে বৃদ্ধ বয়সটাকে কিছুটা সহজ করা সম্ভব। অবশ্য, যে মানুষগুলো কখনও কোনো শখের চর্চা করেইনি, তাদের জন্য কাজটা সহজ হবে না।
প্রফেশনাল সহায়তা– কাউন্সেলিং, থেরাপি, মেডিটেশন অনেক সাহায্য করতে পারে। যদি সেটা করানো সম্ভব হয়। 

শরীরের যত্ন– বিশেষ করে খাওয়া-দাওয়া। এই বিষয়ে অধিকাংশ প্রবীণ খুব অসচেতন। চিরকাল যা খেয়েছি, যেমন খেয়েছি সেই সবই খাব ব্যাস। অন্য কিছু খাব না। কিছুতেই মানতে চাইবে না যে, বয়স হলে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। উল্টো চিত্রও আছে পরিবারের সদস্যরা বয়স্কদের খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে ভীষণ রকম উদাসীন থাকে। অনেক পরিবারেই প্রবীণ সদস্যের পুষ্টির চাহিদা পূরণে আগ্রহী নয়। তাই বলি কি, নিজের শরীর, পুষ্টি নিয়ে শুরু থেকেই সচেতন হোন।

আমাদের দেশের মেয়েরা প্রায় সবাই পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। বিশ্বাস না হলে যে কোনো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করবেন। সব সংসারে মায়েরা তো মাছের কাটা লেজ, মাংসের হাড় খেয়েই জীবন পার করেন। সংসারের সবাইকে ডিম-দুধ দিলেও নারীদের জন্য প্রায়শই সেসব জোটে না।
প্রবীণরা বোঝা নয়। তারা অভিজ্ঞতা ভালোবাসায় পূর্ণ একজন মানুষ। ভালোবাসা ও সম্মান নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য। 

মিতালী হোসেন : চেয়ারপারসন প্রবীণবান্ধব বাংলাদশ (প্রবা)

আরও পড়ুন

×