রাজনীতি
ভাঙনের পথ থেকে তারুণ্যকে বেরিয়ে আসতে হবে
আনিস আহমেদ
আনিস আহমেদ
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৯ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম, ‘জেন-জি’ আধুনিকতা নিয়ে এগিয়ে যাবে। কারণ পরবর্তী প্রজন্ম সবসময় পূর্ববর্তী প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে থাকে। আন্দোলন কিংবা সরকার পতন বাংলাদেশে নতুন বিষয় নয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নতুন বিষয় ছিল তরুণ-তরুণীর নেতৃত্ব। তারা জনমানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে এবং নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যেতে পারত। পরিহাসের ব্যাপার, জেন-জি প্রজন্মের একটি বড় অংশ যেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে যে উদারতা ও প্রগতিশীলতার দিকে দেশ ও সমাজকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল শিক্ষার্থী নেতাদের, তারা সেদিকে যায়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে জেন-জি এমন তত্ত্বকে সমর্থন করছে, যা বাংলাদেশের মানুষ একাত্তর সালেই প্রত্যাখ্যান করেছিল।
দেখে বিক্ষুব্ধ হতে হয়; জেন-জি তরুণ-তরুণীরা মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকৃতি দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত; বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতি তো দূরের কথা। স্বাধীন বাংলাদেশে তারা যেন পাকিস্তান আমল ফিরিয়ে আনতে চায়, যে আমল থেকে মুক্তি পেতে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। বাংলাদেশের সংগ্রাম ও প্রগতিশীলতার ইতিহাস মুছে ফেলতে উদ্যত হয়ে উদ্ধত আচরণ করে চলেছে এই প্রজন্মের বেশ কিছু মানুষ। পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে যেসব মানুষ তাদের সমর্থন করেছিল, তারা অনেকে এখন অসহায় বোধ করছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব আমলেই ছিল তারুণ্য শক্তির আধার। কিন্তু এখন সেই চরিত্রে চিড় ধরেছে। ভোটাভুটি নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, সত্য কথা– ইসলামী ছাত্রশিবির গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই ছাত্র সংসদে জয়লাভ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে জয়যুক্ত সংগঠনটি গণতন্ত্র ও সহাবস্থানে বিশ্বাস করে কিনা। প্রশ্ন জাগছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড দেখে, যেখানে মুক্ত মত ও সহাবস্থান নিয়ে ইতোমধ্যে শঙ্কা জেগেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বিস্তীর্ণ বাংলাদেশে হিন্দুদের বসত ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা তো ছিলই; মুসলমানের মাজার, দরগা, খানকাও রেহাই পাচ্ছে না। একজন ফকিরের লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রাজবাড়ীতে।
এসব যখন চলছে, তখন সরকার ও প্রশাসনের দিক থেকে অভিনব সব অজুহাত খাড়া করা হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি গাজীপুরের কাসিমপুরে দুর্গাপূজার প্রতিমা ভাঙার ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী জোনের সহকারী কমিশনার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘সারাদিন বৃষ্টি ও বাতাস ছিল। বাতাসেই প্রতিমা ভেঙে গিয়েছে, এর বাইরে কিছু নয়’ (ডয়চে ভেলে, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
শুনেছিলাম এক প্রবাদ– ‘ধর্মের কল, বাতাসে নড়ে’। এর অর্থ হচ্ছে অন্যায় করলে তা প্রকাশ পাবেই। প্রতিমা বাতাসে ভাঙেনি, বরং ধর্মের কল এখন যে বাতাসেই নড়ছে– কেবল গাজীপুরে নয়, বাংলাদেশে সর্বত্র সেই সত্যটি ক্রমেই উঠে আসছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। কথা হলো, উদযাপনকারীরা তো শান্তিপূর্ণভাবেই সব সম্পন্ন করেন। অশান্তি করে অন্যরা। এ কথা মানতেই হবে– বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে এখন সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রশ্নটি বিচার করা হয় সংখ্যা দিয়ে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের হিন্দুরা ক্রমেই প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে।
একই ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি সুফিবাদী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে। সাধারণত সুফিবাদে যারা বিশ্বাস করেন তাদের অবনমিত শ্রদ্ধায় সুফিবাদী ধর্মীয় প্রচারকদের কবরকেন্দ্রিক মাজার গড়ে ওঠে। মাজারে যাওয়া ইসলামী মতবাদে কতটা যুক্তিসংগত, সে সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব পাওয়া যায়। যারা ইসলামকে কট্টর আচারসর্বস্ব ধর্ম হিসেবে দেখেন না; স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে প্রেম ও মিলনের বাহন হিসেবে দেখেন তারা সুফিবাদে বিশ্বাস করেন। সুফিবাদ মানুষকে ভালোবাসা শেখায়; ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীল হওয়ার কথা বলে এবং অধ্যাত্মবাদকে তুলে ধরে। কেবল মধ্যপ্রাচ্য়ের দেশগুলোয় নয়; ভারতীয় উপমহাদেশে সুফি-সাধকরা ধর্ম প্রচারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা ভক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে ধর্ম প্রচার করেছেন। সে জন্যই আমরা লক্ষ্য করি, আজমিরে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রা.) কিংবা সিলেটে শাহজালালের (রা.) মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান বহু অমুসলিম।
কেবল মুসলমানরা নন; লালন ফকিরের মতো সাধকরা কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো সাহিত্যিকরাও সুফিবাদে প্রভাবিত হয়েছিলেন। আজ যখন পীর-ফকির ও সুফিদের মাজার নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উন্মত্ততায় কথিত তৌহিদি জনতা একত্র হয়, তখন মনে হয়, স্রষ্টার প্রতি মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে তারা যোজন যোজন দূরত্বে থেকে গেছে।
তাই বলি, এই ভাঙনের রাজনীতি তা সে মণ্ডপ হোক কিংবা মাজার অথবা কোনো ভাস্কর্য, সেখান থেকে আমাদের তারুণ্য শক্তিকে বেরিয়ে আসতে হবে। মনে পড়ে গেল সেই বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত– ‘তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে’। গানটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্বের, যেখানে সৃষ্টি- সুখের আনন্দই প্রধান। কিন্তু আমাদের এই নতুন প্রজন্ম যে ভাঙনের পথ ধরেছে, সেখানে কি আদৌ কিছু সৃষ্টি হচ্ছে? ফলে ফিরে আসাই বিধেয়।
আনিস আহমেদ: লেখক ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- রাজনীতি
- আনিস আহমেদ
- জেন জি
- তারুণ্য
