শিক্ষাঙ্গন
সমীক্ষা ছাড়াই সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত কেন
মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৮ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজকে একত্র করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ গঠনের উদ্যোগ শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি আধুনিক ও বিকেন্দ্রীভূত উচ্চশিক্ষা কাঠামো নির্মাণের প্রয়াস মনে হলেও এ নিয়ে প্রশাসনিক ও নীতিগত প্রশ্ন আছে। শিক্ষা খাতের মতো সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি যথাযথ গবেষণা ও অংশীজনের মত ছাড়াই নেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় শিক্ষা কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি কবি নজরুল কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ– এই সাতটি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও প্রভাবিত করবে। ইডেন ও তিতুমীর কলেজে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষা চালু থাকলেও বাকি পাঁচটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর– তিন স্তরেই শিক্ষা দেওয়া হয়। দেশের সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এই পাঁচটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করে। যদি এই কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়, তবে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার মান ও সুযোগ উভয়ই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাজধানীতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে। এটি শিক্ষা সমতার প্রশ্নে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে সাত কলেজে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। টিউশনির টাকায় পড়াশোনার খরচ চালাতে হয় বলে ঢাকার বাইরের ছোট শহরগুলোতে অবস্থিত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেও শুধু আর্থিক কারণে তাদের পক্ষে অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর যদি আসন সংখ্যা ১০ থেকে ১২ হাজারে নেমে আসে; যেমন অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন– তবে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়বে। এতে শিক্ষার গণতান্ত্রিক চরিত্র নষ্ট হবে; এটি শিক্ষা সমতার প্রশ্নে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করবে, যা সংবিধানের ১৭(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা’র পরিপন্থি।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এ সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে ইডেন ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে নারী শিক্ষার্থীরা একটি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। কিন্তু খসড়া অধ্যাদেশে সহশিক্ষা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা অনেক পরিবারে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা থেকে বিরত করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নারীদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
খসড়া অধ্যাদেশে কলেজগুলোয় পাঠদানকারী শিক্ষকদের দিকটিও উপেক্ষিত। তা ছাড়া প্রশাসনিক বাস্তবতাও এখানে বড় প্রশ্ন। সাত কলেজে বর্তমানে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রায় ১ হাজার ৪০০ কর্মকর্তা কর্মরত। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় তাদের পদ ও পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত স্বতন্ত্র নিয়োগ কাঠামো প্রচলিত থাকবে, তাই শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদ হারানোর আশঙ্কায় আছেন। এতে শুধু প্রশাসনিক অস্থিরতাই নয়; সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শিক্ষা ক্যাডার দীর্ঘদিন ধরে দেশের কলেজ পর্যায়ের শ্রেণি কার্যক্রম থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৩৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এসব শিক্ষার্থীর একটি বিরাট অংশ সরকারি কলেজের ছাত্র, যাদের পাঠদান করেন বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তারা। যারা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। সাত কলেজের পদগুলো হারালে তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমবে; রাজধানীতে কাজের সুযোগ সংকুচিত হবে। ফলে মেধাবীদের এ পেশায় আগ্রহও হ্রাস পেতে পারে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়ন মানে প্রতিষ্ঠানের নাম বা মর্যাদায় পরিবর্তন নয়; বরং পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রকল্পটি যেন কাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অনুশীলন মাত্র।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতা, গবেষণাহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একসময় যথাযথ গবেষণা ছাড়াই এ সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনও কাটেনি। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ভুল নীতি একটি প্রজন্ম নয়, একাধিক প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। তাই এখানে পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নয়; প্রয়োজন টেকসই, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।
সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আগে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ নীতিগত ও একাডেমিক সমীক্ষা। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মত নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ‘লন্ডন ইউনিভার্সিটি’ মডেল বা ভারতের ‘দিল্লি ইউনিভার্সিটি’র কলেজিয়েট কাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে একাধিক প্রতিষ্ঠান তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখেও একাডেমিক উৎকর্ষে অবদান রাখছে।
শিক্ষা সংস্কারে তাড়াহুড়ো নয়; প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উদ্যোগ। অন্যথায় এই প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুধু সাত কলেজ নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই এর ভুক্তভোগী হতে পারে।
ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান: শিক্ষক ও গবেষক
