বাজার
সাত হাত ঘুরে ডিমের দাম বাড়ে
মো. আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২১ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
এ দেশের সব শ্রেণির মানুষের খাদ্যতালিকায় ইদানীং ডিম অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জনপ্রতি বছরে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন সোয়া পাঁচ কোটি ডিম দরকার। উদ্বেগের বিষয়, ডিম উৎপাদনের খামার কমে যাচ্ছে। ২০১০ সালে ছিল এক লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩, যা বর্তমানে ৮০-৯০ হাজার মাত্র। আবার খাদ্য উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। ২২০ নিবন্ধিত কোম্পানির মধ্যে উৎপাদন করে মাত্র ৫০-৬০টি কোম্পানি। উভয় কারণে ডিমের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তা সম্প্রদায়; লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সরাসরি আদেশে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো পরিসংখ্যানে প্রায় ৩০% অতিরিক্ত রপ্তানি দেখিয়েছিল। হয়তো লাইভস্টক পরিসংখ্যানেও বিগত দশকজুড়ে অতিরিক্ত দেখিয়ে আসছে। তা না হলে এসব উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ছে কেন? দেশে বর্তমানে অ্যাক্টিভ লেয়ার খামারির সংখ্যা, প্রতিদিনের উৎপাদনের পরিমাণ, উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা– এসব তথ্যে যথেষ্ট ঘাপলা রয়েছে। সে জন্য জনশুমারির মতো সব খামারির ডেটাবেজ করা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি প্রতি মাসে ডিমের উৎপাদন ও বাজারদর নিয়ে রেগুলেটরি অডিট জরুরি।
পৃথিবীর সব দেশেই হ্যাচারি পলিসি আছে এবং সরকারি ও প্রাইভেট হ্যাচারি যৌথভাবে বাচ্চার জোগান দেয়। বাংলাদেশে অদৃশ্য কোনো ইশারায় সরকারি হ্যাচারি ও ফার্মগুলো নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। তারা যদি ২০-৩০% বাচ্চার জোগান প্রান্তিক পর্যায়ের খামারির কাছে দিত, তাহলে বাচ্চার দাম সহনশীল পর্যায়ে থাকত। দেশে সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ সোনালি মুরগির চাহিদা রয়েছে। অথচ মাত্র দুই লাখ বাচ্চার জোগান কেবল সরকারি হ্যাচারি দিতে সক্ষম।
একটি ডিম পাড়া মুরগি প্রতিদিন ১২০ গ্রাম খাবার খায়, যেখানে খাবার খরচই ৭০-৮০ শতাংশ। খাবার তৈরির মূল উপাদান সয়াবিন ও ভুট্টা, যার সিংহভাগ (৭০%) বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে রিজার্ভের সংকট, ডলারের উচ্চমূল্য, ব্যবসায়ীদের এলসি সমস্যা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে খাবার তৈরির ওই দুটি উপাদানের দাম বেড়ে যায়। ২০১৩ সালে যেখানে এক কেজি সয়াবিনের দাম ছিল ২০ টাকা, তা এখন ৭০ টাকা; তেমনি এক কেজি ১৮ টাকার ভুট্টা এখন ৪০ টাকা। ফলে মুরগির খাবারের দাম বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে খাবার তৈরির ১৫-২০টি উপকরণের প্রায় সবকটির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে মুরগির খাবার তৈরিতে মিট অ্যান্ড বোন মিল ব্যবহার নিষিদ্ধ। কেবল শূকরের চর্বি থেকে তৈরি করা হচ্ছে বলে বাংলাদেশে তা আমদানি নিষিদ্ধ করা হলো। কোনো ধরনের বিকল্প চিন্তা না করেই কেবল ধর্মীয় কারণে নেওয়া ওই হটকারী সিদ্ধান্তও ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণ। বিকল্প প্রোটিন সোর্স হিসেবে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই (বিএসএফ)-এর চিন্তা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে ডিমের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নাকি সাত হাত বদলায়। এমনকি শোনা যায়, কিছু করপোরেট গ্রুপ প্রেরিত একটি এসএমএসের মাধ্যমে ডিমের দাম নির্ধারিত হয় (সমকাল, অক্টোবর ২০২৪)। আড়তদাররা কৃত্রিম বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে হিমাগারে আলুর ন্যায় ডিম মজুত রেখে বাজার অস্থিতিশীল করে (প্রথম আলো, মে ২০২৪)। সে জন্য হিমাগার মালিক, আড়তদার ও তাদের এজেন্টসহ বিপণন-সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
একজন প্রান্তিক পর্যায়ের খামারি যদি তাঁর পণ্য পাইকারি বাজারে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রেল, সড়ক ও জলপথ পরিবহনের সুযোগ পান, তিনি অবশ্যই স্বল্প খরচে ও মধ্যস্বত্বভোগীদের না দিয়ে পণ্য বাজারে আনতে পারবেন। ঢাকায় যেসব পণ্য আসে, তার সিংহভাগই (৯৫%) সড়কপথে। ফলে সিন্ডিকেট সুযোগ নেয় (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩০ নভেম্বর ২০২৪)। বগুড়া থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ১৫ টন সবজি নিয়ে আসা একটি ট্রাকের ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। ২৪০ কিলোমিটার এই পথে অন্তত ১০ জায়গায় মোট ১ হাজার ৫০ টাকা দিতে হয় চাঁদা (কালের কণ্ঠ, ৩০ নভেম্বর ২০২৪)। টোল মওকুফ করা এবং সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।
পরিতাপের বিষয়, সার-বীজসহ কৃষির অনেক উপকরণে কৃষি খামারিরা সহজ শর্তে ঋণ পান। কিন্তু লাইভস্টক খামারিদের কোনো ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার ইতিহাস নেই। সহজ শর্তে ঋণ বা অন্য কোনো উপায়ে তাদের মূলধন জোগানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে খামারির সংখ্যা ঝরে পড়া রোধ হবে।
ড. মো. আবুল কালাম আজাদ: গবেষক ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
- বিষয় :
- বাজার
- ডিম
- নিত্যপণ্যের দাম
- পোলট্রি খামার
