শ্রদ্ধাঞ্জলি
‘এসএমআই’ এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের বিকিরণ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১৯৫১-২০২৫)
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ালেখা শুরু করি, তখন ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে পড়াচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সব টাইটান শিক্ষক। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি। কবীর চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, খান সারওয়ার মুরশিদ, আহসানুল হক, রাজিয়া খান আমীন, নাদেরা বেগম, ইনারি হুসেইন, ইমতিয়াজ হাবীব, ফিরদৌস আজিম, খন্দকার আশরাফ হোসেন, কাশীনাথ রয়, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কায়সার হক, ফকরুল আলম, শওকত হোসেন, বেনজীর দূরদানা, রেবেকা হক, সৈয়দ আনোয়ারুল হক–তাদের সবার সঙ্গে আমাদের দেখা সেই ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে।
সময়টা তখন ভালো ছিল না। এক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মুহুর্মুহু আন্দোলন চলছে, বিশ্ববিদ্যালয় মাসের পর মাস বন্ধ থাকছে। এরই মধ্যে এই শিক্ষকেরা আমাদের পাঠদান করে লেখাপড়ায় আবিষ্ট করে রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ। তাদের সঙ্গে আমরা খুব একটা কানেক্ট করতে পারিনি এবং চেষ্টাও করিনি। কেউ কেউ ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং কেউ কেউ বেশ তরুণ। আমাদের এই শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুই পড়াতেন এবং পড়ানো শেষ করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেন, কেউ কেউ মাঝে মাঝে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতেন এবং কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একেবারে মিশে যেতে পারতেন। যারা আমাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন, তাদের সংখ্যা ছিল কম। হয়তো জানতে চাইবেন তারা কীভাবে মিশে যেতেন? বন্ধুর মতো? না, তারা মিশে যেতেন অভিভাবকের মতো করে।
তাদেরই একজন ছিলেন এসএমআই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম)।
শিক্ষক হিসেবে এসএমআই-এর প্রথম যেই পারদর্শিতা আমি লক্ষ্য করেছিলাম তা হচ্ছে, তিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সেগমেন্ট বা শ্রেণিবিন্যাস বুঝতেন। আমরা কেউ ইংরেজি মাধ্যম থেকে এসেছি, কেউবা শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের, আবার অনেকেই একেবারেই পাড়া-গাঁয়ের ছেলেমেয়ে। তিনি যখন ক্লাসে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য পড়াতেন, তখন সবাই যেন বুঝতে পারে তেমন করে তাঁর কথা এবং শারীরিক ভাষা একসঙ্গে অ্যাপ্লাই করতে পারতেন। তাঁর এই দক্ষতা আমার কাছে অসাধারণ লাগত। এমন একটা বিষয় বাংলাদেশের আশির দশকের বাস্তবতায় আমাদের আর কোনো শিক্ষক ভাবতেন না–এসএমআই ভাবতেন।
এসএমআই তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে আসতে পারতেন তাঁর নিজের মূল্যবোধ দিয়ে।
একটা গল্প বলি–
সময়টা মনে হয় সেকেন্ড ইয়ারের, ১৯৮৭-৮৮ সাল। আমরা সেকেন্ড ইয়ারে ছিলাম আড়াই বছর। এই ক্লাস হয়, এই হয় না; এই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়, এই আবার ক্লাস শুরু হয়। তবে আমরা ক্লাস করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। অনেক মাস পরেও ক্যাম্পাসে ফেরত গিয়ে যখন দেখতাম আমাদের শিক্ষকরা আমাদের নাম-চেহারা মনে রেখেছেন, তখন ভালো লাগত।
সেই সময়, আমি এবং আমাদের আরও অনেক বন্ধু জিনসের শার্ট-প্যান্ট পরতাম। আমি জিনসের শার্ট-প্যান্টের সঙ্গে আর্মিদের লং-বুট পরতাম; কচুক্ষেত বাজারের আর্মি স্টোর থেকে কেনা। আর্মিদের লং-বুটের একটা সুবিধা আছে–ফ্যাশনও হয়, আবার অনেক বেশিদিন টেকে।
আমরা তখন ডিপার্টমেন্টের করিডোরের রেলিংয়ে বসে সিগারেট-চুরুট খেতাম।
এমনই লং-বুট পরা পা-দোলানো এবং কোনো চিন্তা না করেই বুক-ভর্তি ধোঁয়া টেনে ছাড়ার এক দিনে এসএমআই একটা ক্লাস শেষ করে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। সেদিন আমি একা বসে আছি।
-দাও, একটা সিগারেট দাও।
ছাত্রের কাছে স্যারের সিগারেট চাওয়ার এই সাহসটা আমার খুবই ভালো লাগত। সিগারেট দিলাম। প্রথম টানটা দিয়েই তিনি বললেন, ‘শোনো, রিপনকে আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে বলো তো।’
আমি বললাম–‘স্যার, রিপন তো এখানেই আছে; আজকে ক্লাসে এসেছে; আমি বলে দিচ্ছি।’
আমি মনে করেছিলাম আমাদের বন্ধু ‘সাজেদ রিপন’।
এসএমআই বললেন–‘না সাজেদ না; রিপন।’
‘কোন রিপন স্যার?’–আমি জানতে চাইলাম।
‘ছাত্রদলের রিপন; তুমি ছাত্রদল করো না?’
এসএমআই-এর এই প্রশ্নে আমি বেশ দুঃখ পেয়েছিলাম। আমি বললাম–‘জিনস পরলেই কি সবাই ছাত্রদল হয়ে যায়, স্যার? আমি কোনো দলই করি না; আমার মতো এমন আরও অনেকে আছে।’
এসএমআই সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন–‘আই অ্যাম সরি, ভেরি সরি।’
আমি সেই প্রথম কোনো শিক্ষককে তাঁর ছাত্রের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছিলাম। এর পর থেকে এসএমআই-এর সঙ্গে আমার ছাত্র হিসেবে দূরত্ব আর থাকেনি; তিনি আমার মেন্টর হয়ে গিয়েছিলেন।
শুধু মেন্টর নয়, তিনি শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রশাসকের ভূমিকাও অনেকবার নিয়েছেন; যা শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো, তেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরেকদিনের গল্প বলি।
সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল চলছে। পরীক্ষা হয় কলাভবনের চারতলায়। পরীক্ষার হলে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমাদের কয়েকজন বন্ধু সেদিনের পরীক্ষা বানচাল করার ফন্দি এঁটেছে। ওরা খুব সাহসী। মুহসীন-সূর্য সেনে থাকে–ব্যাপারই আলাদা। তবে ওরা এসএমআইকে ইনভিজিলেটর হিসেবে দেখে বেশ নার্ভাস। ওরা যেই অঘটনই ঘটাক, তাঁকে টলানো যাবে না।
পরীক্ষা শুরু হলো। কিন্তু দশ মিনিট না যেতেই পেছনে বাথরুমের দিকে আমাদের বন্ধুরা দুড়ুম-দুড়ুম করে দুটি ককটেল ফাটিয়ে দিল। সারা হল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। অনেকে ভয় পেল, আমরা বিরক্ত হলাম, কিন্তু কেউ ছোটাছুটি করলাম না। আমাদের সময় ককটেল ফাটানো ঝালমুড়ি খাওয়ার মতো ব্যাপার ছিল।
আমাদের ককটেল বন্ধুরা যে যার স্থানে শান্ত হয়ে বসে পড়েছে। ভাবছে–‘যাক পরীক্ষাটা বানচাল করা গেল।’ ঠিক তখন আমরা দেখলাম এসএমআই বাথরুমের কাছে গিয়ে পরিস্থিতিটা দেখে বললেন–‘সবাই শোনো; যারা জানালার কাছে বসেছ, সব জানালা খুলে দাও, ধোঁয়া বেরিয়ে যাক; আমরা দশ মিনিট ব্রেক নিয়ে আবার পরীক্ষা শুরু করব।’
তা-ই হলো–ককটেলের ধোঁয়া বেরিয়ে গেলে আমরা আবার লেখা শুরু করলাম। এমন তাণ্ডবপূর্ণ সময়ে আমাদের শিক্ষকের এই সাহস দেখে শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হয়েছিল।
এসএমআই তাঁর ছাত্রছাত্রীদের জীবনমানসে প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন।
আরেকটা গল্প বলে আজ শেষ করি–
মাস্টার্সের মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে এসে করিডোরে একটা সিগারেটে কেবল আগুন দিয়েছি। কোথা থেকে যেন তিনি এলেন। বললেন–‘দাও, একটা সিগারেট দাও।’
প্রথম টান দিয়েই জানতে চাইলেন–‘পরীক্ষা তো শেষ হলো; কী করবে ঠিক করেছো?’
‘স্যার আমার বাবা চান আমি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরিতে যাই; আমার ইচ্ছে আরও পড়াশোনা করার।’
স্যার হাসলেন। সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকালেন।
তারপর মাথা নেড়ে বললেন–‘নাহ, সরকারি কাজ তোমার জন্য নয়; তোমার সঙ্গে যায় না।’
‘তাহলে?’
‘তুমি এক কাজ করো; সাংবাদিকতা করো; তোমার জন্য সাংবাদিকতা জুতসই হবে।’
‘কিন্তু আমাকে সাংবাদিকতায় কাজ দেবে কে?’
‘শোনো–ডেইলি স্টার নামে একটা পত্রিকা বেরিয়েছে। ওখানে যাও। তৌফিক আজীজ খান আছেন; ওনার কাছে যাও; ওনাকে গিয়ে বলো যে আমি তোমায় পাঠিয়েছি।’
আমি আর দেরি করিনি। তার পরদিনই আমি দৈনিক বাংলা মোড়ে ডেইলি স্টার অফিসে তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। তারপর দুই দফায় ইন্টারভিউ হলো। সেদিন থেকেই সাংবাদিকতা শুরু করলাম।
নিজের স্মৃতি এবং কর্মের কথা বলে এসএমআই-কে স্মরণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্যারকে কৃতজ্ঞতাভরে ধন্যবাদ দেওয়া। এই ধন্যবাদ আমি স্যারের জীবদ্দশায় অনেকবার দিয়েছি এবং তিনি তাঁর চিরাচরিত অভিভাবকসুলভ কণ্ঠে উত্তর দিতেন–‘তুমি একদিন অনেক সম্মানিত হবে।’
এমন শিক্ষককে কেমন করে ভুলে থাকব? এমন ব্যক্তিত্বকে কি কেউ ভুলতে পারে?
ইকরাম কবীর: গল্পকার
[email protected]
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- ইকরাম কবীর
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
