ফিলিস্তিন
অনেক কথা হচ্ছে কাজের কথা ছাড়া
রয় শোয়ার্জ
রয় শোয়ার্জ
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
এই কয়েক দিনে এক অনন্য ঘটনা ঘটছে। প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুসেবকদের পদযাত্রা দেখা গেছে। তাদের যোগ্যতা ও গুণাবলি ভিন্ন, কিন্তু সবার লক্ষ্য এক– ইসরায়েলি বাহিনী যাতে গাজার দুর্বল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করতে না পারে এবং ধ্বংস রোধ করা। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের মধ্যে একজনও মাঠে নেই, এমন খুব কম দিনই রয়েছে। গত সপ্তাহে জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ, জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিওর মতো নেতা তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছিলেন।
ইসরায়েল তাদের ব্যস্ত রাখে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দুজন সৈন্য নিহত হওয়ার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তারা গাজায় একের পর এক হামলা শুরু করে। ফলে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি হতাহত হয় বলে আমরা জেনেছি। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানান এবং নেসেট পশ্চিম তীরকে সংযুক্ত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পাস করে। মার্কিন প্রতিক্রিয়া ছিল ‘না’ এবং ‘কোনোভাবেই না’-এর মাঝামাঝি।
তবুও একাধিক ঘটনা দিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন পরবর্তী পর্যায়ের গাজা পুনর্বাসনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেয়ে যুদ্ধবিরতির বর্তমান অস্থির অবস্থা সামাল দেওয়ার বিষয়ে বেশি মনোযোগী। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আসলে কখন ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তা স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া ওই নিরাপত্তা বাহিনীর সৈন্যদের পরিচয় সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য।
মঙ্গলবার ভ্যান্স বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ওপর বিদেশি বাহিনী চাপিয়ে দেবে না। কিন্তু যদি নেতানিয়াহু সরকার একের পর এক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, যেমনটি তারা এই সপ্তাহে তুরস্কের প্রস্তাব নিয়ে করেছে, তাহলে কী হবে? বিপরীত প্রশ্নও রয়েছে, ইসরায়েলের পছন্দের বাহিনীগুলো মিশনে আগ্রহী কিনা, তাই বা কে নির্ধারণ করবে?
হামাসকে নিরস্ত্র করতে কত সময় লাগবে– এই প্রশ্নও সমানভাবে অস্পষ্ট। ভ্যান্স এই সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘প্রশাসনের প্রতি আমাদের আশা হলো, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী এখন হামাসকে নিরস্ত্র করায় নেতৃত্ব দেবে। এ সময় তিনি বলেন, ‘এতে কিছুটা সময় লাগবে।’
রোববার ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই অনিশ্চয়তা আরও জোরদার করেছেন। তিনি বলেছেন, হামাসকে নিরস্ত্র করার জন্য কোনো ‘কঠোর’ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে না। সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে হামাস সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতায় থাকাকালেই এই আন্তর্জাতিক বাহিনীর অজানা সদস্যরা গাজায় প্রবেশ করতে পারে। তবে তারা কি কোনো শাসকগোষ্ঠী বা গেরিলা আন্দোলনের মুখোমুখি হবে? এগুলো কেবল কয়েকটি প্রশ্নমাত্র, যা এখন আলোচনায় রয়েছে। অন্যরা হয়তো জিজ্ঞাসা করতে পারে, পরিস্থিতির এই পর্যায়ে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কী হবে? কারণ হামাস তার নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করে চলেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও গাজা সীমান্তের উভয় পাশে ইসরায়েলি মিডিয়া যা চেপে রেখেছিল তা তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিটি সংবাদমাধ্যম হামাসের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিটির সম্ভাব্য দিক উন্মোচন করতে মরিয়া হয়ে তার পিছু নিয়েছে। আর সাধারণভাবে যেটা দেখা যাচ্ছে, নিহত ইসরায়েলি জিম্মিদের মৃতদেহ ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে হামাসের বাধার বিষয়টি সংবাদপত্রের শিরোনামে বিভিন্নভাবে প্রাধান্য পেয়েছে।

বিপরীতে সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েলি হামলার ফলে গাজায় বেসামরিক হতাহতের খবর খুব কমই দেখা যাচ্ছে। রোববারের রাফাহ ঘটনার পর ইসরায়েলি প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলার কথাই ধরা যাক, যেখানে দুইজন সৈন্য নিহত হয়েছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ ৪৪ জন নিহতের খবর দিলেও ইসরায়েলি টেলিভিশন ভাষ্যকাররা ‘হালকাভাবে ঘটনার প্রতিক্রিয়া’ জানিয়ে সমালোচনা করেছেন, যেখানে কেবল নামকাওয়াস্তে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।
এটা নতুন কিছু নয়। গত সপ্তাহের শেষ দিকে গাজার সংবাদমাধ্যম ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৪৭ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। যার ফলে ৩৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৪৩ জন আহত হয়েছে। বেশির ভাগ ইসরায়েলি সংবাদবিষয়ক অনুষ্ঠানের কাছে গাজা থেকে সংবাদমাধ্যমের এই দাবি অপ্রাসঙ্গিক ঠেকেছে। সোজা কথায়, পরিকল্পিতভাবে এর গুরুত্ব খাটো করে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে এক ফিলিস্তিনি পরিবারের ১১ সদস্য নিহত হওয়ার খবরও রয়েছে।
গাজার নাগরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, পরিবারটি গাজা শহরের জেইতুন এলাকায় তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তারা বাসযোগে যাত্রাকালে তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা চিহ্নিতকারী ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করার অভিযোগ এনে আক্রমণ করা হয়। এই হলুদ রেখাটি মূলত অদৃশ্য, যা মানুষের চোখে দেখারই সুযোগ নেই এবং তা শুধু মানচিত্র ও সরকারি নথিতে দেখা যায়। রেখাটি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে সবসময় বোঝারও সাধ্য নেই।
এমনকি ইসরায়েলি গণমাধ্যমে সেই ঘটনার খুব একটা উল্লেখ ছিল না। চ্যানেল ১৩ নিউজ তাদের ওয়েবসাইটে সংক্ষিপ্তভাবে এটি উল্লেখ করেছে। একজন আইডিএফ মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, একটি সন্দেহজনক গাড়ি শনাক্ত হওয়ার পর সেনারা তাদের দিকে সতর্কীকরণ গুলি ছুড়েছে। ‘কিন্তু গাড়িটি এমনভাবে সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে যা তাদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চুক্তি অনুসারে সৈন্যরা হুমকি দূর করার জন্য গুলি চালিয়েছে।’ কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সংবাদমাধ্যমের এ ধরনের পরিবেশনার ফলে অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য হামাসই দায়ী। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই ধারণা গাজায় আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো করে তুলবে। এক পর্যায়ে সম্ভবত খুব শিগগির প্রেসিডেন্টের সব লোককে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকের মতো ইসরায়েলের কী করা উচিত নয়– এমন কথা বলা আর যথেষ্ট হবে না। তাদের বলতে হবে– কী করা উচিত এবং ঠিক কীভাবে।
রয় শোয়ার্জ: হারেটজের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক; দ্য গার্ডিয়ান
থেকে ভাষান্তরিত
