ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনপ্রশাসন

আমলাতন্ত্রের সংস্কার সম্ভব?

আমলাতন্ত্রের সংস্কার সম্ভব?
×

শেখ নাহিদ নিয়াজী

শেখ নাহিদ নিয়াজী

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৫৫ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৫৮

সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের দক্ষ, দায়িত্বশীল ও জনমুখী করে তোলা, যাতে তারা রাষ্ট্রের নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিজেদের কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক পদ্ধতি ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এতে প্রশাসনের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আচরণ ও মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যাতে তারা জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখেন ও দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু এত ব্যয়ের পরও সরকারি পরিষেবায় এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে না। 

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা আমলাতন্ত্র এখনও অতীতে আটকে আছে, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের এক নিদর্শন। একটি দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, যা মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বিদেশি শাসকদের সেবা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র এখন জাতির অগ্রগতির চেয়ে নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা রক্ষায় বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। 

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর একাধিক সংস্কার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সরকারি পরিষেবার মূল কাঠামো খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ভাঙা সম্ভব হয়নি’ (সমকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। বাংলাদেশের জনপ্রশাসন ক্যাডারে রূপান্তরিত হওয়া পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) তার অভিজাত মর্যাদা এবং সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। তখন থেকে এটি একটি আমলাতান্ত্রিক ‘অভিজাত’ শ্রেণি তৈরি করেছে, যারা নিজেদের জনসেবক হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দেখেছে। ফলস্বরূপ, তারা সর্বদা অর্থপূর্ণ সংস্কারগুলোকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে, যা তাদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। 

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বা সিভিল সার্ভিসের ওপর ঔপনিবেশিক প্রভাব এখনও বিভিন্নভাবে স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, জেলা কমিশনাররা এখনও বাংলো নামক বিশাল ঔপনিবেশিক ধাঁচের ভবনে বসবাস করেন এবং ঐতিহ্য অনুসরণ করেন। এই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) নাগরিকদের ‘প্রজা’ হিসেবে বিবেচনা করেন। আমলাতন্ত্রের হাতে ক্ষমতার এই কেন্দ্রীকরণ সাধারণ মানুষের জন্য তাদের জীবনকে প্রভাবিত ও কঠিন করে তোলে।

দেশের আমলাতন্ত্রের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ‘নোটিং সিস্টেম’, যা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি করে। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সরকারি অফিসের ফাইলগুলো একাধিক হাতে মতামত ও অনুমোদনের জন্য যেতে হয়। আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, পদোন্নতি ব্যবস্থাটি পুরোনো ধাঁচের। ফলস্বরূপ, নেতৃত্বের ভূমিকা প্রায়ই এমন লোকদের হাতে চলে যায়, যাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব থাকে। যার ফলে অনেক সময় জনবিরোধী নীতিমালা তৈরি এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তা ছাড়া তাদের অধস্তন বা জুনিয়র অফিসারদের জন্য বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হয়। এই প্রতিবেদন বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রস্তুত করা হয় না; বরং এটি খুবই ব্যক্তিগত ও গোপনীয় দলিল। প্রতিবেদনগুলো সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা ও সততার দিক থেকে পেশাদার উন্নতির উপায় খুঁজে পেতে খুব কমই সাহায্য করে।

তবে জনপ্রশাসন ব্যবস্থা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করে। ব্যবসার অনুমতিপত্র পাওয়া বা জমির রেকর্ড করার মতো সহজ কাজগুলো জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। পুরো দীর্ঘসূত্রী প্রক্রিয়া সিস্টেমটির ক্ষতি এবং দুর্নীতির ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবর্তনের প্রতিরোধের ফলে ই-গভর্ন্যান্স গ্রহণের গতিও ধীর হয়ে গেছে। পরিষেবা উন্নত করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিবর্তে অনেক আমলা এটিকে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রপাতির ওপর তাদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। অন্যান্য এশিয়ান দেশ সফলভাবে ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়ন করলেও বাংলাদেশ এখনও সীমাহীন বিলম্ব এবং আমলাতান্ত্রিক বাধার সঙ্গে লড়াই করছে। অবশ্যই ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা প্রক্রিয়াগুলোকে আরও স্বচ্ছ করে তুলবে, সম্ভাব্যভাবে দুর্নীতি হ্রাস করবে– এটি এমন একটি বিষয়, যা অনেক কর্মকর্তা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নন। বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতেও বিষয়টি এসেছে, ‘বিনিয়োগে বাধা অন্যায্য কর দুর্নীতি, আমলাতন্ত্র।’ (সমকাল, ২৯ সেপ্টম্বর ২০২৫)। 

এ রকম জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের যোগসূত্র স্পষ্ট। যদিও দেশটি অনেক দিক থেকে উন্নতি করেছে, ধীর এবং জটিল সরকারি প্রক্রিয়াগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি এবং জনসেবাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করে তোলে যখন আমরা দেখি, চলমান ব্যবস্থাটি পরিবর্তন বা সংস্কারকে কতটা একগুঁয়েভাবে প্রতিরোধ করে। 

তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত, বিবেকবান এবং  সচেতন একটি অংশ নাজুক ব্যবস্থার ভেতর থেকে পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলছে। বাংলাদেশের অগ্রগতি, জনসেবা উন্নত করার জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালানো গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ এবং পদোন্নতির ওপর মনোযোগ দেওয়া, যাতে দক্ষ ব্যক্তিরা সংস্থাগুলোকে নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়া সরকারের উচিত কার্যকরভাবে ই-গভর্ন্যান্স চালু করা, যাতে কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি পায় এবং দুর্নীতি কমানো যায়। 

বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আসল ট্র্যাজেডি কেবল সময় এবং সম্পদের অপচয় নয়। এটি সুযোগ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া। কিন্তু ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সংস্কারমনস্ক কর্মকর্তাদের প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আশার আলো দেখা দেয়। প্রশ্নটি এখন আর পরিবর্তন আসবে কিনা তা নয়, বরং প্রশ্নটি হলো একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তা যথেষ্ট শিগগিরই ঘটবে কিনা। 

শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক; ইংরেজি বিভাগ; স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ 
[email protected]

আরও পড়ুন

×