ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

জুলাইযোদ্ধার ঝুলন্ত লাশ!

জুলাইযোদ্ধার ঝুলন্ত লাশ!
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৮ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শনিবার জুলাইযোদ্ধা সংসদের সাবেক আহ্বায়ক আরমান আহমদ শাফিনের নিজ বাসায় ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে। যদিও অনেকে বলছেন, এর কারণ পারিবারিক কলহ। তবে জুলাইযোদ্ধা অনেকে এ ঘটনা হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করছেন। তারা এও বলছেন, পারিবারিক কলহ বলে মূলত বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। ফলে বিষয়টি খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। 

প্রতিবেদনমতে, রাজধানীর দক্ষিণখানের উত্তর ফায়দাবাদের বাসা থেকে ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় আরমান শাফিনের লাশ পাওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় খাটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসা ছিল। তা ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে পায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যা স্বাভাবিকভাবে সন্দেহের উদ্রেক করে। 

গত বছর জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরই মধ্যে এক বছরের বেশি সময় পার হলো। অন্যদিকে সংস্কার, জুলাই সনদ, গণভোট ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন সংকট দেখা যাচ্ছে। তা ছাড়া মাঝে মাঝে বিশেষত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ইঙ্গিতবহ। এই উত্তাল সময়ে একজন জুলাইযোদ্ধার এভাবে ঝুলন্ত লাশ পাওয়া উদ্বেগের। দুই মাস আগে তুরাগ থানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও জুলাইযোদ্ধা কেএম মামুনুর রশীদকে অপহরণের ঘটনা ঘটে, ‍যদিও এ ব্যাপারে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ক’দিন আগে মুফতি মোহেববুল্লাহ নিজেই নিজেকে ‘অপহরণ’-এর কথা স্বীকার করেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করেছে। এসব ঘটনার প্রতিটি উৎকণ্ঠার! 

গণঅভ্যুত্থানের পরও যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। দেশ এখনও যে অনিশ্চয়তার পরিপূর্ণ– এসব ঘটনা তারই প্রমাণ। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় জড়িত শত শত আসামি এখন জেলে। আবার এসব মামলায় যথেষ্ট প্রক্রিয়াগত সমস্যা রয়ে গেছে। বহু ক্ষেত্রে পারিবারিক ও রাজনৈতিক বৈরিতা মামলা প্রদানে প্রভাব ফেলেছে, যা ইতোমধ্যে পত্রপত্রিকায় স্পষ্ট। 

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীরা এখন দেশে-বিদেশে পলাতক, কিন্তু তাদের অনেকের আর্থিক অবস্থা বেশ শক্তিশালী। তারা বিদেশে থেকেও বিভিন্ন সহিংসতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাবেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মী অনেকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফলে তারা সুযোগ বুঝে পাল্টা প্রতিশোধ নিতে পিছপা হননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ ধরনের একটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জুলাইযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আরমান আহমদ শাফিনের ঝুলন্ত লাশও বিচ্ছিন্ন করে ভাবার সুযোগ নেই। 

সুতরাং যেসব ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটছে, তা থেকে দেশ সহিংসতার দিকেও ধাবিত হতে পারে। তবে যদি অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে বহু সমস্যার নিরসন সম্ভব। কিন্তু ইতোমধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া, জুলাই সনদ, গণভোট ও নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমন এক ধরনের ঐক্যের আভাস দেখা যাচ্ছে, সেই সঙ্গে অস্থিরতার মাত্রাও কোনো অংশে কম নয়।  

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যেসব অপহরণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হয়ে তদন্ত করা উচিত। যদি আমরা এসব ঘটনা খোলাসা করতে না পারি, তা সমাজে বিদ্যমান ভয়ের সংস্কৃতি আরও জোরালো করে তুলবে। এ জন্য সরকারকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা রাখা জরুরি। আরমান শাফিনসহ যাদের লাশ পাওয়া গেছে কিংবা অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, এগুলোর ব্যাপারে অচিরেই সুষ্ঠু তদন্ত করা অপরিহার্য। অন্যথায় আমাদের আরও গভীর সংকটের মধ্যে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।

ইফতেখারুল ইসলাম, 
সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×