ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

সরল পথ ছেড়ে জটিলতায় কেন সরকার?

সরল পথ ছেড়ে জটিলতায় কেন সরকার?
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২১ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই সনদ স্বাক্ষর-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল সমীকরণের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিরোধ দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অভিজ্ঞতা থেকে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ করেছে আট মাস ধরে। সংবিধান, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুদক ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের ১৬৬ সুপারিশ নিয়ে সুদীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ৮৪টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করতে হবে এমন ৪৮টি প্রস্তাবের ৩৬টিতে এক বা একাধিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে।

ভিন্নমতসহ ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেন। বলা হয়েছে, যে দল যে সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তা নির্বাচনী ইশতেহারে রেখে জয়ী হলে আগামী সংসদে তারা সে অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এরপরই শুরু হয় আশ্চর্য জটিলতা। স্বাক্ষরিত সনদের সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য পেশকৃত সুপারিশে গরমিল পাওয়া যায়। আশ্চর্যজনকভাবে এও বলা হয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে সংসদ ২৭০ দিনের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কারের কাজ শেষ করতে না পারলে প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে। অন্যদিকে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ থাকলেও ঐকমত্য কমিশন ভিন্নমত না রাখার সুপারিশ করে। 

এ পরিস্থিতিতে ঐকমত্য কমিশনে সংলাপরত মুখ্য তিন দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে। বিএনপি জানায়, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অগ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি দ্রুত সুপারিশ বাস্তবায়ন চায় বলে জানিয়ে দেয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ওনারা (ঐকমত্য কমিশন) যে প্রস্তাব উত্থাপন করলেন প্রধান উপদেষ্টার কাছে, সেখানে নোট অব ডিসেন্টের কোনো কথাই নাই; আমাদের এই কথাগুলো বেমালুম ভুলে গেছে। তারা আবার নতুন করে কিছু নিয়ে এসেছে। এটা অন্যায়, এটা জনগণের সঙ্গে একটা নিঃসন্দেহে প্রতারণামূলক কাজ’ (প্রথম আলো, ২ নভেম্বর, ২৫)। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘যারা একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা এখন একাত্তরকে নিচে নামিয়ে দিতে চায়, তারা শুধু চব্বিশের জুলাইয়ের যে আন্দোলন, তাকে বড় করে দেখাতে চায়। ১৯৭১ সাল হচ্ছে আমাদের জন্মের ঠিকানা। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে সবসময়।’

২. 
দেরিতে হলেও বিএনপির এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও জুলাই সনদে সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ– ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র  বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্পষ্টত রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রকৃত চেতনার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। ধর্মীয় পরিচয় যদি রাষ্ট্রের প্রধান বিষয় হতো, তবে পাকিস্তান এক রাষ্ট্র হয়েই টিকে থাকত; পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক আচরণ ও নিপীড়নে কখনোই ধর্ম বিবেচনার বিষয় হয়নি। দুই দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যই ক্রমে বিভেদের সূচনা করে; ক্রমশ এ দেশের মানুষকে শৃঙ্খলমুক্তির মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে যায়। তাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অন্যতম আত্মপরিচয়ের স্মারক– ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের সীমিত সম্পদ ব্যবহারের জন্য সমাজতান্ত্রিক ধারণা তথা সামাজিক ন্যায়বিচারও সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয় একই চেতনায়। বাংলাদেশ যেসব মূল প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং যেসব প্রত্যয় পাকিস্তানের আদর্শ থেকে বাংলাদেশকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছে, সেসব স্তম্ভ রাষ্ট্র থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে কার স্বার্থে? কেন? 

৩.
সংবিধান সুপারিশের যে ব্যবস্থাপত্র ঐকমত্য কমিশন জমা দিয়েছে, তা সার্বভৌম সংসদের ক্ষমতার প্রতি রীতিমতো হুমকি। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে আগে দেখা যায়নি– একটি কমিশন জানিয়ে দিচ্ছে, সংসদকে এই সময়সীমার মধ্যে এ সকল কাজ করতে হবে। নইলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর বলে গণ্য হবে! এ আচরণ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি তীব্র অবহেলা। সংসদ সদস্যদের সামনে যদি খড়্গের মতো ঝুলতে থাকে– আপনি যা-ই করুন না কেন, ২৭০ দিন পার হয়ে গেলেই আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে, তখন সংসদ সদস্যরা সময়ের চাপে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে উপযুক্ত বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্তের দিকে যাবেন। এই রীতি গভীর সাংবিধানিক সংকট ও রাষ্ট্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি করবে। 

গণভোটের জন্য প্রস্তাবিত প্রশ্ন দুটিও জটিলতায় আকীর্ণ। দুই ক্ষেত্রেই গণভোটে ৪৮টি সাংবিধানিক ইস্যুর একটি বিহিত চাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি প্রসঙ্গ; রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন ও বিরোধী দলকে আরও শক্তিশালী করবার মতো মৌলিক উদ্যোগ। রয়েছে সব নাগরিকের পরিচয় বাংলাদেশি; প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট মেয়াদ ও প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান হিসেবে থাকতে পারবেন না ইত্যাদি প্রস্তাব।

যে পরিস্থিতি এখন, তাতে ভোটারকে পুরো প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’বাচক সম্মতিদান বা ‘না’বাচক প্রত্যাখ্যানমূলক ভোট দিতে হবে। কারও পক্ষে কোনোটিতে ভিন্নমত প্রদানের সুযোগ থাকছে না। গণভোটের এই জটিল প্রক্রিয়া এ দেশের সাধারণ মানুষের কয় শতাংশ বুঝতে সক্ষম? গণভোট কবে এবং আদেশ কে জারি করবে, সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে ঐকমত্য কমিশন।

সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এক সপ্তাহের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দিতে না পারে, তাহলে সরকার তার মতো সিদ্ধান্ত নেবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। 

কী দাঁড়াল তবে? ২৭০ দিন আলোচনার পর? এ দেশের গণতন্ত্রের জন্য ঐকমত্য কমিশনের জটিল গোলকধাঁধার ‘সুপারিশ’ প্রয়োজন নেই; সরকার যদি সরল ও স্বচ্ছভাবে আদর্শ নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম যা প্রয়োজন, তার ব্যবস্থা করে; তাই যথেষ্ট হবে। সরল-সোজা পথে না হেঁটে সরকার নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকে অহেতুক ঢাকঢাক গুড়গুড় করে চলেছে। সার্বভৌম সংসদই শেষ কথা। কাজেই সরকারকে সব দ্বিধা ঝেড়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বন্দোবস্ত করতে হবে। এ দেশে নির্বাচন নতুন নয়; এর আগে ছলচাতুরীর যত নির্বাচন হয়েছে, সবই সরকারের সিদ্ধান্তে ও ইচ্ছায়। সুষ্ঠু কয়েকটি নির্বাচনও হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কাজেই এবারও সরকারকেই সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছায় আর সব উপচিন্তা বাদ দিয়ে সাহস ও সারল্যকেই মূল পুঁজি করে এগোতে হবে। 

বাংলাদেশের সমাজ ও মানুষ বহু ঘাত­-প্রতিঘাতের পরও ৫৪ বছরে পা দিয়ে টিকে রয়েছে এবং আগামীর স্বপ্ন দেখছে; পশ্চিমের দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতদের হাতে গড়া ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বোঝা যায়– এই পোড়া দেশের মানুষ আজ সম্ভবত নিরীক্ষার বিষয়ে পরিণত। নইলে সার্বভৌম সংসদের প্রতি অবহেলা দৃশ্যমান হয় না। একই সঙ্গে পশ্চিমে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ব্রাত্য; ধর্ম ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়; সেই পশ্চিমা শিক্ষিতজনদের হাতে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিও এত প্রশ্রয়মণ্ডিত হয় না। সম্ভবত ঐকমত্য কমিশনের পশ্চিমা শিক্ষিতরা ভাবছেন, এই দেশের জন্য অলৌকিকতাই উদ্ধার। অলৌকিকতা নয়, মানুষের গণতান্ত্রিক শুভশক্তির প্রতি সরকারের বিশ্বাস রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যে সচ্ছ ও সরল-সোজা পথেই মুক্তি; অহেতুক জটিলতা সমস্যাকে আরও ঘন করবে কেবল।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×