অর্থনীতি
খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের অবস্থা ও অভিজ্ঞতা
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:০২ | আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৪
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ এবং বিগত শাসনামলে ব্যবসায়ী-শিল্পপতির একাংশের ওপর অন্যায়-অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সহায়তায় বৃহৎ মন্দ বা দুর্বল ঋণগুলো পুনর্গঠনে বাছাই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়। দেশ-বিদেশে ঝুঁকি ব্যবস্থাপক হিসেবে অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আমাকেও এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হয়।
দীর্ঘ চার মাসাধিক সময়ে আমরা প্রায় তিনশ বড় ঋণ গ্রহীতার বিষয় বিবেচনায় নিতে পেরেছি। তাদের বেশির ভাগই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ নিয়েছেন। বেশির ভাগেরই অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল; অধিকাংশেরই হিসাব বিভাগে লোক নেই। তাদের এক-তৃতীয়াংশই ২০০৯-২০২৪ সময়ে বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের প্রায় অর্ধেক ব্যাংকের মালিক, পর্ষদ ও পেশাজীবীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আবার প্রায় সবারই ঋণের বিপরীতে জামানত বা সহজামানতে ঘাটতি ছিল। নিজের ব্যবসা খাতের ভবিষ্যৎ উত্থান-পতন বা প্রতিযোগিতা নিয়েও অনেকে অনভিজ্ঞ। প্রশ্ন জাগে, এমতাবস্থায় তারা ব্যাংকগুলো থেকে শত শত কোটি টাকা কীভাবে বের করলেন? এমনকি কেউ কেউ বিদেশেও পাচার করতে পারলেন?
আমরা জানি, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে খেলাপি ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি, পুনঃতপশিল করা ঋণ ৩ লাখ ৪৯ হাজার কোটি এবং অবলোপন করা ঋণ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট বকেয়া ঋণের ৪৫ শতাংশে।
অন্যদিকে কেবল দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের হার মোট বকেয়া ঋণের ২১ শতাংশ। যে কোনো বিচারে এবং এশিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় এ হার কেবল অগ্রহণযোগ্য নয়; চরম ঝুঁকিপূর্ণও বটে, যা অর্থনীতিকে নিঃসন্দেহে দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, খেলাপি ঋণের এমন বৃদ্ধির মূল কারণ হঠকারী ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, দুর্বল তদারকি, খেলাপি ঋণ আদায়ে ধীরগতি ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে প্রায় অনালোচিত রয়ে গেছে হঠকারী ঋণ অনুমোদনের পাশাপাশি কিছু ব্যাংকের ঋণ বিতরণের নামে যথেচ্ছ লুটপাট এবং জেনেশুনে বেনামি ঋণ বিতরণের উদ্যোগ। ইসলামী ধারার কমপক্ষে পাঁচটি ব্যাংককে নজিরবিহীনভাবে একক পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে ঋণের নামে যা ঘটানো হয়েছে, সেটাকে অবাধে লুটপাটই বলা চলে। প্রথম প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকও এ প্রবণতায় প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে।
অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতপশিলের নামে বারবার খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে বারবার পুনঃতপশিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়ার ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে। তারপর আরেকবার ২০০৩ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ১৫ শতাংশ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম সেই পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে। তৃতীয়বার পুনঃতপশিল করার জন্য ডাউন পেমেন্টের হার রাখা হয়েছিল মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কিংবা মোট বকেয়ার ৩০ শতাংশ। ২০১২ সালে ডাউন পেমেন্টের হার, পুনঃতপশিলের সর্বোচ্চ মেয়াদ ইত্যাদি পরিবর্তন করে জারি হয় পরিবর্তিত নীতিমালা।
তারপর ২০১৫ সালে ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্বমন্দার বিরূপ প্রতিক্রিয়া’ বিবেচনা করে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ ঋণ গ্রহীতার জন্য ৫০০ কোটি টাকার ওপর খেলাপি ঋণের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ সুযোগের মাধ্যমে ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার মধ্যকার ঋণের জন্য ২ শতাংশ এবং এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ১ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ছয় থেকে ১২ বছরের জন্য পুনঃতপশিলে নীতিমালা করা হয়েছিল। এসব ঋণের জন্য সুদহারেও দেওয়া হয়েছিল বিশেষ ছাড়। কিন্তু কিছুতেই বিশেষ কাজ হয়নি। 
২০২২ সালে ঋণখেলাপিদের বড় ছাড় দিয়ে আবারও জারি হয়েছিল নতুন নীতিমালা। এ নির্দেশনায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে চারবার ঋণ পুনঃতপশিল করা এবং সর্বোচ্চ ২৯ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় খেলাপি ঋণ কম রাখার জন্যই এমন অবাধ সুযোগ; কারণ দাতা সংস্থাগুলো ঋণ শ্রেণীকরণে জোর দেয়। ডাউন পেমেন্ট কমানোর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, ঋণখেলাপিদের পক্ষে ১৫ শতাংশ জোগাড় করা কঠিন।
বিভিন্ন সময়ে এমন খেলাপিদের পক্ষে উদার নীতিসহায়তা সত্ত্বেও দেশের খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো আকাশ ছুঁয়েছে। কখনও ব্যবসায়ীদের দাবি কিংবা চাপে, কখনও দাতা সংস্থা বা বিদেশিদের কাছে প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখতে বারবার পুনঃতপশিলের উদ্যোগেও সুফল পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ নীতিমালায় ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ‘নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শ্রেণীকৃত হওয়া ঋণগ্র হীতাদের ব্যবসা পুনর্গঠনে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিনিময়ে ৮ বছরের জন্য পুনঃতপশিলের সুযোগসহ রাখা হয়েছে সুদের হারে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা। নতুন নীতিমালায় এ সুবিধা পাওয়া গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ না করার অবকাশ পাবেন।
এবারের সুযোগ কতখানি সফল হবে, সেটা বোঝার জন্য আমাদের ২ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এ দুই বছরের মধ্যে ঋণ গ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধ ক্ষমতা নিরূপণ করাও সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে নতুন নীতিমালার অধীনে ঘোষিত সুবিধা পাওয়ার জন্য অনেকে যেভাবে উদ্যোগী হয়েছেন সেটা সামাল দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত খেলাপি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। খেলাপি ঋণকে সাধারণত দুভাগে ভাগ করা হয়– ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনে যুক্ত করা হয়েছিল ইচ্ছাকৃত খেলাপিবিষয়ক ধারা। কিন্তু সেই সংযোজন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি আইনটির দুর্বলতা ও তৎকালীন সরকারের অনীহার কারণে।
অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে, লুণ্ঠিত ও বেনামি ঋণ আদায় প্রায় অসম্ভব হলেও ঋণের নামে এ লুণ্ঠনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজেয়াপ্ত করতে হবে তাদের সম্পদ। ঋণ বেনামি হলেও নেপথ্যের মূল হোতারা ব্যাংকের অজানা থাকার কথা নয়। সুতরাং তাদের শনাক্ত করাও কঠিন নয়। সেই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতে বাধ্য করতে হবে ব্যাংকগুলোকে, যাতে ভবিষ্যতে খেলাপির সংখ্যা না বাড়ে। বিগত শাসনামলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এ বিষয়ে কিছুই করা হয়নি; বরং লুণ্ঠনকারীরা পেয়েছে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশ্রয়। ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনেক কাহিনি তো রূপকথাকেও হার মানায়।
বর্তমান অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আমরা দেখেছি, একমাত্র ব্যাংক খাতে দৃশ্যমান কিছু কাজও হয়েছে। কিন্তু আমাদের যেতে হবে বহুদূর। এই দূরের যাত্রাপথের সাথিকে যেমন চিনে নিতে হবে, তেমনি প্রয়োজন যুগোপযোগী রাজনীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- মামুন রশীদ
- খেলাপি ঋণ
