অভিবাসন
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ফাঁদে বাংলাদেশি জনশক্তি
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
উচ্চ বেতনে চাকরির আশায় রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছেন বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনপ্রত্যাশী তরুণ অনেকেই। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেউ কেউ মুখোমুখি হয়েছেন ভয়াবহ বাস্তবতার। রাশিয়ায় পৌঁছে তাদের সে দেশের সেনাবাহিনীর অংশ হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হয়েছে। দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে থাকা এসব তরুণ ও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ কেউ ইতোমধ্যে মারা গেছেন, কেউ আহত হয়ে চিকিৎসাধীন; অনেকে রয়েছেন নিখোঁজ।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ ফেসবুকে লাইভে এসে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর দৃশ্য দেখিয়েছেন। কেউ অস্ত্র হাতে, কেউ বাংকারের ভেতর থেকে বলছেন কেমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা দিন কাটাচ্ছেন। কারও ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ; দেখা যাচ্ছে বিস্ফোরণের আলো। কেউ কেউ কাঁপা গলায় বলছেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল চাকরি দেবে, কিন্তু এখন আমরা যুদ্ধে।’ এসব দৃশ্য শুধু সামাজিক মাধ্যমে নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলেও উদ্বেগ তৈরি করবে নিশ্চয়।
আমরা সবাই জানি, এ সবকিছুর শুরু কিন্তু দালালদের প্রতারণা থেকে। দালাল চক্র রাশিয়ায় কৃষি বা নির্মাণ খাতে ভালো বেতনের চাকরি আছে, থাকা-খাওয়ার সুবিধাও মিলবে– এ ধরনের প্রলোভন দিয়ে থাকে তরুণদের। অনেকে এই প্রলোভনে পড়ে পরিবারের সঞ্চয়, এমনকি ঋণ নিয়ে বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছার পর দেখা যায়, প্রতিশ্রুত চাকরি নেই, বরং স্বল্পমেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র। বলা হয়, ‘এখন তোমরা সেনা।’ তারপর পাঠিয়ে দেওয়া হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে মৃত্যু আর জীবনের মাঝের দূরত্ব মাত্র কয়েক মুহূর্ত।
এই তরুণদের অনেকেই কখনও ভাবতে পারেননি, ভিনদেশে গিয়ে ভিনদেশের এক যুদ্ধে তাদের অংশ নিতে হবে। কেউ কেউ এখন ফেরার পথ খুঁজছেন। যারা ফিরে এসেছেন তারা দাবি করছেন, কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বা অনেকের খোঁজই মিলছে না। কিছু পরিবার দূতাবাস বা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তাদের প্রিয়জনদের উদ্ধারে। এ যেন এক অচেনা যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া জীবনের মর্মন্তুদ গল্প।
মানবাধিকার ও শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে প্রতারণার মাধ্যমে বা জোরপূর্বক সামরিক কাজে যুক্ত করা সম্পূর্ণ বেআইনি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, এটি মানব পাচারের শামিল। অর্থাৎ যারা এই তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে, তারা শুধু দালাল নয়, বরং মানব পাচারকারী।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনই রাশিয়া ও ইউক্রেন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি, যাতে সেখানে যুদ্ধরত বা আটক বা নিখোঁজ বাংলাদেশি তরুণদের অবস্থান জানা যায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা এবং রেড ক্রসের সহযোগিতায় তাদের দ্রুত উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশে যারা এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের অপরাধের শিকড় অনেক গভীরে। তাই শুধু কয়েকজন দালালকে আটক নয়; পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
তরুণদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি। বিদেশে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে যারা প্রতারণা করে, তাদের শনাক্ত এবং জনগণকে সাবধান করতে হবে। বিদেশে যাওয়ার আগে যাচাই-বাছাই ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কেউ মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে না পড়েন। দেশের প্রত্যেক অভিবাসনপ্রত্যাশী শ্রমিক যেন জানতে পারেন, বৈধ কাজের ভিসা কেমন, কোন ধরনের চাকরিতে কী ঝুঁকি থাকতে পারে। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে যৌথভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, এই তরুণেরা কোনো অপরাধী নন। তারা আমাদের সেই প্রজন্ম, যাদের রয়েছে স্বপ্ন পরিবার ঘিরে; নিজের জীবনকে একটু তুলনামূলক ভালো করতে। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব আর দুর্বল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে তারা পড়ে গেছেন মৃত্যুফাঁদে। আমরা আশা করব, রাষ্ট্র তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হবে। শুধু উদ্ধার নয়; এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আমরা নিরাপদ অভিবাসনের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠাতে চাই, কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিস্থিতিতে নয়; যুদ্ধের জন্য তো নয়ই।
রাশিয়ার যুদ্ধ হয়তো আমাদের কাছে দূরের কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাত মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অনেক পরিবারের কান্না, হতাশা আর হারানোর গল্প। এই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে যে তরুণ ফেসবুকে লাইভে বলছেন– ‘আমরা যুদ্ধ করতে চাইনি, শুধু চাকরি করতে চেয়েছিলাম’, তাঁর সেই কণ্ঠস্বর আসলে আমাদের সবার জন্য এক নির্মম প্রতিধ্বনি।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- অভিবাসন
- আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
- রাশিয়া
