ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

শিক্ষকদের বারবার রাজপথে নামতে হয় কেন?

শিক্ষকদের বারবার রাজপথে নামতে হয় কেন?
×

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের শিক্ষকরা বারবার যেভাবে বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় নামছেন এবং পুলিশের হামলার শিকার হচ্ছেন, তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। শনিবার শাহবাগে আন্দোলনরত শিক্ষকদের পদযাত্রা কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা করেছে। লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেডে শিক্ষকরা আহত হয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো আমরা জানি। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক দিয়ে প্রথম শ্রেণির শিক্ষা সম্ভব নয়। প্রশ্ন– প্রথম শ্রেণির শিক্ষক আমরা কীভাবে পেতে পারি। সে জন্য আমাদের সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। আমাদের নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে সিদ্ধান্ত নেবেন নীতিনির্ধারকরা।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারায় আমরা বিশ্ব জ্ঞানসূচকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। শিক্ষার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শিক্ষক প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকার ফলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা বিনিয়োগ ও শিক্ষানীতি সংস্কারে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনকভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শিক্ষায় গুণগত বিনিয়োগ বাড়ানো ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষক তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ জরুরি।

মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক হলো শিক্ষার ভিত্তি। কোনো বিল্ডিং যখন তৈরি করা হয় তখন ফাউন্ডেশনেই বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। ভিত্তি শক্ত করার প্রয়োজনে কাঁচামাল, লোহা থেকে শ্রমিক, কারিগরসহ সবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষার কারিগর হলেন শিক্ষকরা। আমরা এখানে যে কারিগরদের নিয়োগ দিচ্ছি, তারা কতটা মানসম্পন্ন– তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা দেখেছি, ২০২০ সালে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৫তম থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করেছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষকরা অনেক দিন ধরে দশম গ্রেডের জন্য আন্দোলন করছেন। এবারও সে আন্দোলন করতে এসে তারা মার খেলেন। আমরা বেতন দেব অল্প অথচ বিশ্বমানের শিক্ষা চাইব, তা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।

আমাদের নীতি হওয়া উচিত ছিল, ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষকদের নবম গ্রেডে নিয়ে আসা হবে। নবম গ্রেড মানে প্রথম শ্রেণি। একটা মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এটা নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও হাত দিতে হবে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন যেভাবে পৃথক ব্যবস্থায় বিচারকদের নিয়োগ দেয়, শিক্ষকদের জন্য এমন বিশেষ কর্তৃপক্ষ দরকার। প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণ ও যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষক দেওয়া দরকার। তাদের পদোন্নতিও হবে কর্মদক্ষতার মাধ্যমে। গড়পড়তা পদোন্নতি হলে যোগ্য শিক্ষকদের মূল্যায়ন হবে না কিংবা যোগ্যতা বের করা সম্ভব হবে না। কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমেই তার স্বীকৃতি নিশ্চিত হবে।

যোগ্যতার ভিত্তিতেই শিক্ষকদের পদোন্নতি কিংবা গ্রেড দেওয়া উচিত। শিক্ষকের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। যেমন আইইএলটিএস পরীক্ষার কথা আমরা জানি; মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ শেষ হলে তাকে আবার পরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যেমন পাবলিকেশনসহ বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার সময় শিক্ষকের যে যোগ্যতা ছিল, তা বেড়েছে বা কমেছে কিনা, তারও মূল্যায়ন দরকার। আমি মনে করি, পাঁচ বছর পরপর যে কোনো পর্যায়ের প্রত্যেক শিক্ষকের দক্ষতা পরীক্ষা করতে হবে। তিন বছরেও হতে পারে। যারা উত্তীর্ণ হবেন তারাই পদোন্নতি পাবেন। আমি গড়পড়তা দশম গ্রেড দেওয়ার পক্ষপাতী না। আমি মনে করি, এ শিক্ষকদের নবম গ্রেড দিতে হবে, কিন্তু তার সে যোগ্যতা থাকতে হবে। কর্মদক্ষতা ভালো থাকলে অষ্টম গ্রেডও পেতে পারেন। শিক্ষকদের এই কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে একটি প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, রাষ্ট্র যারা চালাচ্ছেন বা আগেও ক্ষমতায় ছিলেন তারা এভাবে চিন্তা করছেন না। তারা কেবল ঘষামাজা করেন। এখানে ওখানে একটু সংস্কার করেই দায় সারতে চান। শিক্ষা বিষয়কে আংশিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে শিক্ষক যেমন গুরুত্বপূর্ণ; পরিবেশ, পুস্তকসহ প্রতিটি উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ি যেমন চলতে হলে তার পুরো সিস্টেম ঠিক হতে হয়, শিক্ষাও অনুরূপ। সে জন্য নীতিগত বিষয় ঠিক করতে হবে। শিক্ষকের সামনে যদি ভিশন না থাকে; তার উন্নয়নের সুযোগ না থাকে, তবে তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। 

প্রাথমিকে যেসব শিক্ষক নিয়োগ পান, তাদের অনেকেই চলে যান। সে জন্য প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সেখান থেকে যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুসারে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের বিষয় আসবে। সে জন্য প্রথম শ্রেণির বেতন কাঠামোও দিতে হবে। এখানে বড় ধরনের পরিবর্তন জরুরি।
আমাদের বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর চিন্তা করতে হবে। বাস্তবতা হলো, শিক্ষার বিষয় এলেই সরকার কেবল বাজেটের দোহাই দেয়। অথচ প্রশাসনে আমরা দেখেছি, খিচুড়ি রান্না শিখতেও বিদেশে যায়। তারা গাড়ি-বাড়ি সবই পায়। শিক্ষকের কথা বললেই তখন বাজেটের টানাটানি শুরু হয়। শিক্ষা যে বড় বিনিয়োগ, এটা সরকার সেভাবে চিন্তাই করতে পারছে না।   

শিক্ষকদের সম্মান ও সম্মানী দিতে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। শিক্ষা বাজেটের যে সুপারিশ ইউনেস্কো ঠিক করে দিয়েছে, আমরা তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারছি না। অথচ সেভাবে বরাদ্দ হলে শিক্ষার অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। তখন চিন্তা করতে হবে না যে এত বেতন বাড়বে, এত টাকা বেশি লাগবে। এটা শিক্ষকদের প্রয়োজন। বর্তমান বাজার কিংবা সংসারের খরচের যে বহর, তার সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো বেমানান। আমরা যখন প্রথম শ্রেণির শিক্ষক নিশ্চিত করতে পারব তখন কাঙ্ক্ষিত জাতি গঠনও সহজ হবে। আমরা যদি জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত জাতি গড়তে চাই, তবে তেমন শিক্ষক চাই। শিক্ষকদের ছোট রেখে ভালো শিক্ষা নিশ্চিত হতে পারে না। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকদের যে প্যাকেজ, আমাদেরও তার কাছাকাছি যেতে হবে। তা নিশ্চিত না হলে শিক্ষা নিয়ে সাময়িক পদক্ষেপ তেমন কাজে আসবে না।

পুলিশের বাড়াবাড়ির বিষয়টি না বললেই নয়। এর আগেও তারা শিক্ষকদের ওপর মারমুখী হয়েছেন। তাদের জবাবদিহির আওতায় আনলে নিশ্চয় শনিবার পুলিশের সেই পুনরাবৃত্তি হতো না। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা নাকি বাউন্ডারি ভেঙে এগিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মিডিয়াতে আমরা দেখেছি, সবাই যেখানে একত্রে ছিলেন, সেখানে তারা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও শিক্ষকদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন? পুলিশের আক্রমণের ধরন অনাকাঙ্ক্ষিত। তারা শিক্ষকদের বুঝিয়েও সরাতে পারত। আমাদের যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আছেন, তিনিও গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে বসতে পারতেন। তিনি যে কথাটা মিডিয়ার সামনে বলছেন, তা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে বলতেন। পুলিশ যেভাবে আগের মতো একই প্রক্রিয়ায় আচরণ করছে, তা স্বভাবতই আমাদের হতাশ করেছে।  

আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসছে সরকার। আলোচনায় নিশ্চয় সমাধান আসবে। তবে স্থায়ী সমাধান কতটা হবে, সে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য সংকটের মূলে হাত দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণির সুবিধা নিশ্চিত করে কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে তাদের পদোন্নতি হলে তা স্থায়ী ও টেকসই হবে। এ ক্ষেত্রে নতুন পে কমিশন কাজ করতে পারে। মানসম্মত শিক্ষক তৈরিতে তাদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে।

ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ: অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
(আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×