ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

সুদানিজদের জন্য টিকে থাকাই শেষ কথা নয়

সুদানিজদের জন্য টিকে থাকাই শেষ কথা নয়
×

অ্যামি পোপ

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

এই সপ্তাহে সুদানের আল-আফাদ শিবিরে এক মায়ের সঙ্গে আমার দেখা, পাঁচ বছর বয়সী কন্যা ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে যিনি হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন। এখানে আল-ফাশারের পতনের পর শত শত পরিবার পালিয়ে এসেছে। ওই মা ও তাঁর পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আগে এক সামরিক হাসপাতালে তাঁর ছোট মেয়েটির মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করা হয়।

মেয়েটি এখন চুপচাপ তার মায়ের পাশে বসে থাকে। সে বিনয়ী, বিচ্ছিন্ন ও বাচ্চাদের মতো আর খেলা করে না। তার মা মানুষকে প্রহারের অনেক ঘটনা বলেছেন। তিনি দেখেছেন, রাস্তার ধারে মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছে। তিনি এতই দুর্বল মানুষের কথা বলেছেন, যারা হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছেন এবং ড্রোনের নজর এড়াতে অস্থায়ী পরিখা তৈরি করছেন। বেশির ভাগ পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে অথবা সেখানে আটক রাখা হয়েছে। কোনোভাবে তিনি আল-আফাদে পৌঁছেছেন কিন্তু তাঁর মেয়ের আঘাতের চিহ্ন খুঁজে বের করা এবং ডিসেম্বরের পরিস্থিতি তুলে ধরার সময় তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আর তাঁর মেয়ের ফলোআপ চিকিৎসার জন্য সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে তাঁর উৎকণ্ঠা স্পষ্ট ছিল।

নিশ্চয় তাঁর গল্পটি একমাত্র গল্প নয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুতি সংকটে সুদানের অভ্যন্তরে প্রায় এক কোটি মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছেন এবং চার কোটিরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে গেছেন। দারফুর ও কর্ডোফানজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সবাইকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা বানানোর ঘটনা ঘটছে এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।
১৮ মাসের অবরোধ শেষে আল-ফাশারের পতন ঘটে। ফলে নতুন করে নৃশংসতা শুরু হয়। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে জাতিগতভাবে নির্মূলের লক্ষ্যে হত্যাযজ্ঞ চালানো, যৌন সহিংসতা এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত আক্রমণ। এগুলো কেবল ট্র্যাজেডি নয়; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। বেসামরিক নাগরিকদের দরকষাকষির কোনো সুযোগই নেই। অবশ্যই তাদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং মানবিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সুদান একসময় সুযোগের দ্বারপ্রান্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিবাসীরা এখানে পড়াশোনা, কাজ ও ব্যবসা করতে আসত। এর শহরগুলো ছিল প্রাণবন্ত ও বিশ্বজনীন। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ অঞ্চলের উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। আজ সেই একই রাস্তাগুলো বিপরীত দিকে পালিয়ে আসা লোকেদের দ্বারা পরিপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় সুদানিরা এখন লিবিয়া ও তার বাইরেও চলে যাচ্ছে, নিরাপত্তা ও কাজের সন্ধানে গিয়ে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। যে দেশটি একসময় আশ্রয় দিত, এখন তা লোকদের পালিয়ে যেতে বলে।
সত্য, এমনকি ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও অনেক সুদানি ফিরে আসার চেষ্টা করছে। খার্তুম, সেনার ও গেজিরায় পরিবারগুলো বিধ্বস্ত এলাকা ও লুটপাটের শিকার বাড়িগুলোতে ফিরে আসছে। তবে তাদের প্রত্যাবর্তন ধৈর্যের নিদর্শন নয়; বরং উদ্দেশ্যের প্রকাশ। মানুষ পুনর্নির্মাণ করতে চায়। তারা শান্তি চায়।
জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থায় আমরা আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছি। আশ্রয় সামগ্রী, স্বাস্থ্যবিধি সরঞ্জাম, খাদ্য এবং ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে বাস্তুচ্যুতির ওপর নজর রাখতে বৃহত্তর পর্যায়ে নির্দেশনা দিচ্ছি। কিন্তু নিরাপদ করিডোর, সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া এমনকি সর্বোত্তম সম্পদের সহায়তা কর্মসূচিও ব্যর্থ হবে।

মানবিক সহায়তা কেবল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে; যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে না। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তহবিলের ঘাটতি কেবল অর্থের বিষয় নয়। এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র টেকসই পথ হলো আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা, যা সুদানের জনগণকে তাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ করে দেয়। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতাদের শান্তি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য উপলব্ধ সব ধরনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি হাতিয়ার ব্যবহার করতে হবে।
যদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সুদানের পুনরুদ্ধার সম্ভব। দেশটির জমি উর্বর, জনগণ সক্ষম এবং সম্ভাবনাও অপরিসীম। এক দশকের মধ্যে সুদান আবার নিজের খাদ্য সংগ্রহ করে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারবে। কিন্তু পুনরুদ্ধারের জন্য টেকসই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন; কেবল জরুরি সাহায্য নয়; বরং শাসন, শিক্ষা ও জীবিকা নির্বাহে বিনিয়োগ দরকার; যা মানুষকে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে দেয়।

অ্যামি পোপ: মহাপরিচালক
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা

আরও পড়ুন

×