প্রতিস্বর
হোয়াটসঅ্যাপের ফাঁদে
ইকরাম কবীর
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের এক বন্ধু সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে চলা তাঁর অফিসের রাত প্রায় দেড়টার এক আলোচনায় অংশ নিতে ব্যর্থ হন। কারণ তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। পরের কর্মদিবসে তাঁর সহকর্মীরা এ নিয়ে তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি এক গভীর মানসিক চাপে পড়ে যান। এবং তা এতটাই যে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা খুদে ব্যবসা শুরু করতে হয়।
আজকের অফিস সংস্কৃতিতে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের যে রীতি চলছে, তাতে মনে হয় এমন পরিস্থিতিতে আমাদের এই বন্ধু একা নন। আমার সঙ্গে এমন অনেক মানুষের পরিচয় আছে, যারা এই ভয়ে ভোগেন; তারা ভাবেন যে সরকারি বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য টেক্সট মেসেজে সাড়া দিতে ব্যর্থ হলে তাদের চাকরি খোয়াতে হতে পারে।
অফিসের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো সবসময় সচল থাকে, কেউ না কেউ কিছু না কিছু পোস্ট করে। কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশীজনের সঙ্গে মিটিং করে ছবি পোস্ট করেন; কেউ দেন পুরস্কার পাওয়ার ছবি। কেউ মৃত্যুবরণ করলে বা কারও নিকটাত্মীয় মারা গেলে, সেখানে শোকবার্তার ঢল নামে। কেউ অসুস্থ হলে শত শত ‘গেট ওয়েল সুন’ বা ‘প্রেয়ারস ফর ইয়োর আরলি রিকভারি’ মেসেজে ইনবক্স পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমাদের সবাইকেই লিখতে হয়। আমরা অনেক সময় এক ধরনের বাধ্যতা বোধ করেই স্বেচ্ছায় এসব প্রতিক্রিয়া জানাই। আমরা মনে করি, কিছু না কিছু বলতেই হবে বা অন্তত একটা ইমোজি তো দিতেই হবে। যদি না দিই, তাহলে আমরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করি এবং ভয় পাই যে, আমাদের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আমাদের নীরবতা লক্ষ্য করছেন এবং আমাদের প্রতি তাদের আশীর্বাদ চলে যাচ্ছে; যাকে আমরা ডিজিটাল যুগে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ নামে জানি।
একজন সুপারভাইজার (আমিসহ) হয়তো ছুটির দিনে হোয়াটসঅ্যাপে জরুরি মিটিংয়ের জন্য একটা জুম লিংক শেয়ার করলেন। কেউ দেখল, অনেকেই দেখল না। যারা দেখল না, তাদের অদক্ষ বলে বিবেচিত করতে আমাদের সময় লাগে না। আমরা ধরেই নিই যে ‘ওকে দিয়ে আর হচ্ছে না’। কিন্তু ভুলে যাই যে আমরা ছুটির দিনেও সহকর্মীদের কাজে মগ্ন থাকতে বাধ্য করছি।
আমরা কি এমন পরিস্থিতি তৈরি করছি না, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহার অতিরিক্ত চাপের কারণ হয়ে যাচ্ছে? হোয়াটসঅ্যাপের এই আলোচনাগুলো প্রায়ই রাতে হয়, বেশ রাতে, যখন সবাই ঘুমায়। তাই হোয়াটসঅ্যাপের ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ আমাদের দীর্ঘ সময় জাগিয়ে রাখছে এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করছে।
সাধারণত আমরা যখন হোয়াটসঅ্যাপে কোনো মেসেজ কাউকে পাঠাই, তখন আমরা ‘ব্লু টিক’-এর জন্য অপেক্ষা করি, তাকিয়ে থাকি যে যাকে পাঠালাম তিনি দেখলেন কিনা। আমরা যারা সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছি, তারা জানি যে এই ‘ব্লু টিক’ কীভাবে আমাদের মনোযোগ লুট করে। আমরা শুধু মনোযোগই হারাই না, আমরা কাজেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি, কারণ আমরা বারবার আমাদের পাশে রাখা ফোনের দিকে তাকাই। আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, যাকে মেসেজ পাঠালাম তিনি দেখলেন কিনা। কখনও কখনও ‘ব্লু টিক’ দেখা যায় না এবং তা আমাদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে। মেসেজের উত্তর যদি দ্রুত না আসে, আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।
বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের গ্রুপে চ্যাট করতে গিয়ে অনেক সময় এমন তর্কাতর্কি শুরু হয়, যা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি চরমে পৌঁছায়। অনেক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়; ফোনে বা সামনাসামনি কথা বলার চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটের মাধ্যমে কথোপকথন এতই ঝুঁকিপূর্ণ যে অনেক সময় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে করতে আমরা এই মাধ্যমে আসক্ত হয়ে পড়ি, কারণ এখানেই হাজারো ছবি, ভিডিও ও রিল এসে জমা হচ্ছে। আমরা এখন বুঝি যে এই মাধ্যম কমিউনিকেশন বা মানবিক যোগাযোগে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কহানি এবং মানসিক-শারীরিক ক্লান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক অফিসে হোয়াটসঅ্যাপে আলোচনা শুধু রাত ১০টার পর শুরু হয় না, অনেক সময় ধরে চলে সেই চ্যাটিং। রাতে অনেকেরই ঘুম হচ্ছে না এবং পরের দিন তার প্রভাব পড়ছে। আমরা এর নেতিবাচক প্রভাব এখন সবাই বুঝি এবং মুক্তির উপায় খুঁজি, কিন্তু কিছু বলতে ও করতে পারি না।
অবশ্য, বিশ্বে অনেক কোম্পানি আছে, যারা এখন হোয়াটসঅ্যাপ কমিউনিকেশনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। শুনেছি বাংলাদেশেও কিছু কোম্পানি তাদের সহকর্মীদের রাত ৮টার পর আর হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করে। তাদের অনুসরণ করে অন্যদেরও নিয়ম তৈরি করা উচিত, কাজ-সংক্রান্ত মেসেজ আমরা শুধু অফিস চলাকালীন বিনিময় করব বা বড়জোর রাত ৮টা পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করব। ছুটির দিন বা সাপ্তাহিক ছুটিতে কেবল জরুরি প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করব।
আমরা হোয়াটসঅ্যাপ ডিটক্স শুরু করতে পারি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস দিয়ে। প্রতি দশ মিনিটে মেসেজ চেক করার প্রয়োজন নেই। মেসেজ চেক করার এই তাড়নাই আমাদের মনে চাপ সৃষ্টি করছে। মেসেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিতে হবে– এই চাপ অনুভব করার প্রয়োজন দেখি না। সময় নিয়ে উত্তর দিলে তারা অসময়ে মেসেজ পাঠানোর বিষয়ে আরও চিন্তাশীল হবে।
আমরা মেসেজ বিনিময়কালে আরও চিন্তাশীল হতে পারি। সর্বোপরি, একটি সীমারেখা স্থির করা খুব জরুরি।
অফিসে বা সামাজিকভাবে সবসময় সংযুক্ত থাকার এই সংস্কৃতি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে অনেক চাপ সৃষ্টি করছে। আসুন এটি নিয়ে ভাবি এবং এই ফাঁদ থেকে মুক্ত হই।
ইকরাম কবীর: গল্পকার
[email protected].
- বিষয় :
- ইকরাম কবীর
- হোয়াটসঅ্যাপ
- মানসিক চাপ
