ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

গাজায় আদৌ কোনো যুদ্ধবিরতি চলছে না

গাজায় আদৌ কোনো যুদ্ধবিরতি চলছে না
×

ইয়ারা হাওয়ারি

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩১ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

অক্টোবরের ১০ তারিখ যখন গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা হয়, তখন অনেক ফিলিস্তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন। সেখানে দুই বছর একটানা যে বোমাবর্ষণের মধ্য দিয়ে গেছে, তার বিস্ফোরণ ক্ষমতা ১৯৪৫ সালে হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার প্রায় ছয় গুণ বলা যায়। যে গাজার মধ্যে তারা এই বোমা বর্ষণ করেছে, তা আয়তনের দিক থেকে জাপানের ওই শহরের অর্ধেকেরও ছোট। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় চতুর্দিক থেকে। গাজার সব হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা ফেলা হয়েছে। সেখানকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। স্যুয়ারেজ ও বৈদ্যুতিক লাইনের পরিস্থিতি এমন, যা মেরামতের অযোগ্য। ধারণা করা হয়, পাঁচ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ গাজাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, যার নিচে অন্তত ১০ হাজার ফিলিস্তিনির মৃতদেহ রয়েছে, যারা বোমায় শহীদ হয়েছেন, কিন্তু এখনও তাদের শনাক্ত করা যায়নি।

গাজাবাসী যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যে স্বস্তি আশা করেছিল, তা আসেনি। ‘অস্ত্রবিরতি’ ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনী আবার গাজা উপত্যকায় বোমা বর্ষণ শুরু করে। তখন থেকে তা আর থামেনি। গাজার সরকারি মিডিয়ার তথ্য অনুসারে, ইসরায়েল ৪৪ দিনে প্রায় ৫০০ বার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, যাতে ৩৪২ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ২৯ অক্টোবর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ, সেদিন ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী ১০৯ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে ৫২ জন ছিল শিশু। গত বৃহস্পতিবার গাজা সিটির কাছে জেইতুন এলাকায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় একটি ভবনে আশ্রয় নেওয়া পুরো পরিবারসহ ৩২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন। কেবল বোমা বর্ষণই চলছে না; তাদের ক্ষুধামুক্তিও ঘটেনি। 

‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির শর্ত অনুসারে প্রতিদিন গাজায় ৬০০ ট্রাক ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। অথচ ইসরায়েল তা মানেনি। আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ আর-খাউদারির প্রতিবেদন অনুসারে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী আইওএফ কেবল ১৫০টি ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে। এমনকি তারা পুষ্টিকর খাবারসহ মাংস, দুধ, সবজির পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং আশ্রয়ের তাঁবু প্রবেশেও বাধা দিচ্ছে।

ফিলিস্তিনি ত্রাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের তথ্য অনুসারে, গাজায় এখন যে পরিমাণে ত্রাণ প্রবেশ করছে, তাতে গাজাবাসীর এক-চতুর্থাংশ মৌলিক প্রয়োজনও পূরণ হচ্ছে না। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনআরডব্লিউএর মতে, তাদের গুদামে গাজার প্রত্যেকের জন্য কয়েক মাসের খাবার আছে, কিন্তু তা ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অক্টোবরে যে মত দিয়েছে, এটি তার সরাসরি খেলাপ। সেখানে বলা হয়েছে, ইউএনআরডব্লিউএসহ জাতিসংঘের কোনো সংস্থার ত্রাণ সাহায্য কেউ আটকাতে পারবে না।   

ইসরায়েল ইউএনআরডব্লিউএর নিরপেক্ষতা নিয়ে যে অভিযোগ করেছে, আদালত সে অভিযোগও খারিজ করেছেন। বরং আদালত নিশ্চিত করেছেন, সংস্থাটি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। তবুও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী এখনও ইউএনআরডব্লিউএর ত্রাণ বিতরণে বাধা দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কর্মীদের ভিসা দিচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজের জানুয়ারি ২০২৪ সালের আদেশে বর্ণিত অস্থায়ী পদক্ষেপগুলোও মানছে না ইসরায়েল। সেখানে বলা হয়েছিল, গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। এই গণহত্যা প্রতিরোধ, গণহত্যায় উস্কানি বন্ধ করা ও শাস্তি প্রদান এবং গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আদালত পরবর্তী সময়েও একাধিকবার এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু ইসরায়েল তা উপেক্ষা করে চলেছে। এটি সম্ভব হচ্ছে, কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েল অভূতপূর্ব কূটনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সমর্থন পাচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ, ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে ২০ দফা পরিকল্পনা অনুমোদন পেয়েছে। ২০ দফার এই পরিকল্পনায় আছে দুই ভাগ করে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। 

এ পরিকল্পনায় ত্রাণ বিতরণের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কাঠামোকে অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি গাজায় যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে এবং এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য কোনো ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ নেই। সে কারণেই এ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছে এবং গণহত্যার সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রকে গাজার নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দিচ্ছে।

এ সবকিছুই স্পষ্ট করছে– গাজার ‘যুদ্ধবিরতি’ আদৌ কোনো যুদ্ধবিরতি নয়। ইসরায়েল সেখানে হামলা অব্যাহত রেখেছে; ফিলিস্তিনিদের ক্ষুধার্ত রেখেছে এবং তাদের যথাযথ আশ্রয় ও চিকিৎসায় বাধা দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পরও গাজা পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে জন্য এটি এক কূটনৈতিক প্রতারণা। যার মাধ্যমে গাজাবাসীর নিশ্চিহ্নকরণ ও বাস্তুচ্যুতির আড়াল করা হয়েছে এবং বিশ্ববাসী ও বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের নজর ঘুরিয়া দেওয়া হয়েছে।

ইয়ারা হাওয়ারি: ফিলিস্তিনি পলিসি নেটওয়ার্ক আল শাবাকার সহপরিচালক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

 

আরও পড়ুন

×