রাজনীতি
অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে খারিজকরণের রাজনীতি
জোবাইদা নাসরীন
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৪ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বেশ কিছু ইংরেজি শব্দ রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়েছে এবং বারবার উচ্চারিত হয়ে চলেছে। তার মধ্যে দুটো শব্দ হলো ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘ইনক্লুসিভ’। তবে ফ্যাসিস্ট শব্দটি গত বছরের ৫ আগস্টের আগে-পরে আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হলেও এখন আর তা শুধু ওই দলটির জন্য বরাদ্দ নেই। উগ্রবাদী আচরণের সমর্থক দল-গোষ্ঠীমাত্রই এ নেতিবাচক বিশেষণের ভাগীদার হচ্ছে। সম্প্রতি বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়ে গণঅভ্যুত্থানের শরিকরাই একে অপরকে ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিস্টের দোসর বলে আখ্যা দিচ্ছে।
‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দের প্রয়োগও পাল্টে গেছে এ কয়েক মাসে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিকরণের যে আকাঙ্ক্ষা গত বছরের আন্দোলনে ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছিল, সেটিতে প্রথম আঘাত করা হয় অভ্যুত্থানের পরপর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ওপর চলে সহিংসতা। তার ধারাবাহিকতায় একটি সংগঠনের আপত্তির মুখে পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী লেখা পাতাসমৃদ্ধ গাছের গ্রাফিতি তুলে দেওয়া হয়।
এখানেই শেষ নয়। জনপরিসরে নারীবিরোধী বক্তব্য চলতে থাকে। নারীকে বাদ দিয়েই একের পর এক সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবির সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাত্মতা ঘোষণা, বাউল-ফকির এবং সুফিবাদীদের ওপর বারবার আক্রমণ, বিরুদ্ধ মত দমনে মব সহিংসতা ইত্যাদি ইতোমধ্যে ‘ইনক্লুসিভ’ সমাজ এবং রাষ্ট্র তৈরির স্বপ্নের কফিনে একের পর এক পেরেক ঠুকেছে।
নির্বাচন ঘিরে যা চলছে তাও ওই প্রক্রিয়ারই অংশ কিনা– সে প্রশ্নও উঠেছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রাওয়া ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অনেক কথার সঙ্গে এটাও বলেছিলেন, ‘আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি, হি কমপ্লিটলি অ্যাগ্রিজ উইথ মি, দেয়ার শুড বি ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন’ (বিবিসি, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)। অন্তত সরকারের তরফ থেকে তখন এ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ কেউ করেনি। মানুষ ধরেই নিয়েছিল, আগামী নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে। সব মতের মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থী খুঁজে পাবেন। কিন্তু ইদানীং প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা নির্বাচন সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইনক্লুসিভ শব্দটা আর বলছেন না। ইনক্লুসিভ নির্বাচন মানে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নিয়ে নির্বাচন– সাধারণ মানুষ এমনটাই বোঝে। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া ইনক্লুসিভ নির্বাচন হবে না– এটা দেশে টেলিভিশন টকশোর অনেক আলোচক যেমন বলছেন; তেমনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে সরকারি প্রতিনিধির পাশাপাশি অনেক এমপি ও বিশ্লেষকও বলছেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বলছে, আওয়ামী লীগ ছাড়াও ইনক্লুসিভ নির্বাচন সম্ভব।
নির্বাচনকেন্দ্রিক এই ইনক্লুসিভিটির আলোচনা এর আগের তিনটি নির্বাচনেও ছিল। সেই নির্বাচনগুলোতেও সব মহল থেকে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জোর তাগিদ ছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার সেই পরিবেশ তৈরি করেনি। সংগত কারণেই আজকে যেসব দল প্রাধান্য বিস্তার করে আছে, তারা সেসব নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচনগুলো দেশে-বিদেশে কোনো মহলেই ‘গ্রহণযোগ্য’ হয়নি।
এদিকে সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ নির্বাচন মানেই হলো এমন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতি, বয়স, স্তরের মানুষ এবং প্রান্তিক গোষ্ঠী অংশ নেবেন, ভোট প্রদান করবেন। সকলেই নির্বাচনকেন্দ্রিক সব ধরনের তথ্য ও সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু ইনক্লুসিভ নির্বাচনকেন্দ্রিক চলমান বিতর্কে বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। মূলত অংশগ্রহণ এবং অর্ন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানকে এক করে দেখার চেষ্টা চলছে। সবচেয়ে অবহেলায় থাকছে ইনক্লুসিভ নির্বাচনে জনগণের ভূমিকা। ধরেই নেওয়া হচ্ছে, জনগণ এসবের কিছুই বোঝে না।
তবে কি আমরা অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে ক্রমশ এক্সক্লুসিভ বা খারিজধর্মী নির্বাচনের দিকেই এগোচ্ছি?
এ কথা বলার কারণ নিরাপদ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত না করে বরং বেশির ভাগ মানুষ যেন শঙ্কা ও ভয়ের মধ্যে থাকে, উত্তরোত্তর সেই পরিস্থিতিই তৈরি করা হচ্ছে। তা না হলে কেন নির্বাচনের আগে একটি গোষ্ঠীকে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার দাবিতে সমাবেশ ডাকতে হয়, যেখানে বিএনপিসহ প্রায় সব প্রধান দলের নেতা একাত্মতা ঘোষণা করেন? একের পর এক নারীবিদ্বেষী বক্তব্য, বিভিন্ন পেশাজীবীর বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান, নারীর কর্মপরিধি নির্ধারণ, ধর্মীয় অতিরিক্তপনা ইত্যাদি ভোটের পরিবেশকে অশান্ত করছে। এ পরিবেশ বিশেষত প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
ইনক্লুসিভ নির্বাচনের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা। কিন্তু গত ১৫ মাসে আইনশৃঙ্খলার যে নাজুক অবস্থা হয়েছে এবং জননিরাপত্তা যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, সে পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের সময় সামগ্রিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ইনক্লুসিভ নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনমনে আস্থা অর্জন অতি জরুরি।
কিন্তু আমাদের সব মনোযোগ আটকে আছে ইনক্লুসিভের নামে কাউকে ‘ঠেকাও’ এবং খারিজকরণের রাজনীতির মধ্যে। এটি চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে স্থায়ীভাবে স্বাগত জানাচ্ছি ‘বাতিলকরণ’-এর রাজনীতিকে, যা মূলত ইনক্লুসিভের পরিবর্তে এক্সক্লুসিভ নীতির বহিঃপ্রকাশ। এ থেকে বের হতে না পারলে কার কী লাভ হবে, জানি না। জনগণের যে কোনো লাভ হবে না– তা হলফ করেই বলা যায়।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- জোবাইদা নাসরীন
- রাজনীতি
- জুলাই গণহত্যা
