প্রতিস্বর
সড়কে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা
ইকরাম কবীর
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
খবর বেরিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ২৭৪টি; নিহত পাঁচ হাজার ৫৩৭ এবং আহত চার হাজার ৪৯৩ জন। যেন খবর নয়, একটা নীরব শোকগাথা; যা কেউ পড়েন না বা পড়েও ব্যবস্থা নেন না বা কী ব্যবস্থা নিতে হবে তা নিয়ে চিন্তা করেন না।
এই দুর্যোগ হঠাৎ করে উদয় হয়নি, অনেক বছর ধরেই আমাদের জীবনে নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে দুর্ঘটনা, হতাহতের সংখ্যা–সবকিছু আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। মানুষ মরছে, আমরা শিরোনাম দেখছি, আবার মানুষ মরছে, আবার শিরোনাম হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, পরিবার–সবাই মৃত্যুগুলো দেখে ‘অভ্যস্ত’ হয়ে গেছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। আমাদের মন এমনই অনুভূতিহীন হয়ে গেছে যে আমরা বুঝতেই পারি না চেষ্টা করলেই এই ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।
পরিসংখ্যান বলছে সড়কেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও মৃত্যু হয়েছে; রেলপথ, নৌপথে কম। আহতের সংখ্যা নিহতের চেয়ে বেশি। যারা মরে গেলেন তারা তো একপ্রকার বেঁচে গেলেন। যারা বেঁচে থাকছেন, তারা আর ‘আগের মতো’ বাঁচতে পারছেন না। হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি, অপারেশন, প্লেট লাগানো, পঙ্গুত্ব, কাজ হারানো–এইসব কে হিসাব করছে আমরা জানি না। আমরা কেবল নিহতের সংখ্যা গুনে চলেছি; আহত হয়ে বেঁচে থাকার যাতনা বোঝার চেষ্টা করছি না।
দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেল চালকরা মারা যাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এটা এখন শুধু বাহন নয়; কর্মজীবনের বাস্তবতা–হোম ডেলিভারি, চাকরি, ছোট ব্যবসা, শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে চলাচল–প্রায় সবাই এই বাহনের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই বাস্তবতায় আমরা এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। হেলমেট আছে, কিন্তু তা কি মানসম্মত? সবাই হয়তো পরছেন, কিন্তু ঠিকভাবে পরছেন কি? গতি নিয়ন্ত্রণের আইন আছে, কিন্তু তা কি প্রয়োগ হচ্ছে? প্রায় সবারই লাইসেন্স আছে, কিন্তু তারা কি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন?
প্রাইভেটকার, বাস, ট্রাক, রিকশা, ব্যাটারি রিকশা–সবই কোনো না কোনোভাবে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের চলাচল ব্যবস্থা একটা মিশ্র ঝুঁকির জায়গা–একই রাস্তায় বাস-ট্রাকের গতি, মোটরসাইকেলের চলার স্থান, ব্যাটারি রিকশার ক্ষিপ্রতা, পথচারীর হাঁটা–সব সঙ্গে চলে। কিন্তু পরিকল্পনা? আলাদা লেন? নিরাপদ ক্রসিং? কার্যকর সিগন্যাল? ফুটপাত? দৃশ্যমান জেব্রা ক্রসিং?
কেন এত মৃত্যু হয়, কীভাবে হয়, আর কেন আমরা থামাতে পারি না? কেন চালকের লাইসেন্স পাওয়া এত সহজ? এটা কি শুধু একটা কাগজ? কেন বাস-ট্রাকের চালককে দীর্ঘ সময় নির্ঘুম রেখে আমরা আশা করি সে দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে পারবে? কেন কাজের চাপ, মালিকের তাড়া, ট্রিপের টার্গেট–সবকিছু মিলে চালককে ঝুঁকির মেশিন বানিয়ে ফেলেছি?
কেন পথচারীরা এখানে সবচেয়ে অসহায়? কেন রাস্তা পার হওয়া এখানে সবচেয়ে কঠিন কাজ? কেন স্কুলের সামনে স্পিড ব্রেকার, সতর্কতা সাইন, ট্রাফিক সহায়তা নিয়মিত নয়? কেন ফুটপাত দখল হয়ে যায়, আর মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় হাঁটে? কেন রাতের বেলায় হেডলাইটের ঝলক আর উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িগুলো রাস্তাকে একটা মৃত্যুফাঁদ করে তোলে?
দুর্ঘটনার পরপরই আমরা অনেক সময় নষ্ট করি। অ্যাম্বুলেন্স থাকে না বা আসতে দেরি করে, হাসপাতালগুলোতে ট্রমা সেবা নেই বললেই চলে, রক্ত জোগাড় করতে পরিবার ছোটাছুটি করে, কাগজপত্রের কাজ সারতে সময় পেরিয়ে যায়, তারপর ‘এখান থেকে ওখান’ করতে করতে জীবন হয়রান হয়ে যায়। তাহলে মৃত্যুগুলো শুধু সড়কেই হচ্ছে না, আমাদের সিস্টেমের মধ্যে দিয়েও ধীরে ধীরে ঘটছে। আমরা কি সত্যিই জরুরি সেবাকে ‘জরুরি’ করে তুলতে পেরেছি?
এসব প্রাণহানির জবাবদিহি কে করছে? কেউ না। গাড়ি চাপা দিলে ঘটনাটিকে আমরা ‘দুর্ঘটনা’ বলছি, তবে ‘অপরাধ’ বলছি না। মামলা হয়, কিন্তু সাক্ষী মেলে না; সমঝোতা হয়, ক্ষমতাবানরা প্রভাব খাটান। আমরা এখন বুঝে গেছি যে এই দেশে রাস্তায় মৃত্যু হলে তার বিচার হবে না।
আমরা এই মৃত্যুগুলো মেনে নিয়েছি, কারণ যারা মারা যাচ্ছেন তারা বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ–শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম থেকে শহরে কাজ খুঁজতে আসা মানুষ, মোটরসাইকেলে অফিস করা মানুষ, বাসে বাড়ি ফেরা মানুষ। এই মৃত্যুগুলো খবর হয়, কিন্তু আমরা শোকার্ত হই না; নীতিনির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারীর মনে দাগ কাটে না। মৃত্যুগুলো একটা অদ্ভুত অবহেলায় পড়ে থাকে।
আমরা যদি সত্যিই মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিই, তাহলে যে প্রশ্নগুলো রাখলাম তার উত্তর সততার সঙ্গে দেওয়া প্রয়োজন। প্রতি মাসে প্রায় একই সংখ্যায় মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিশ্চুপ। সড়কগুলো কি আমাদের উন্নয়নের প্রতীক, নাকি অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুর মঞ্চ?
কাউকে দোষারোপ করছি না। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি যে এই মৃত্যুগুলোকে থামাতে হবে। নিরাপদ সড়ক মানে শুধু আইন নয়; সঠিক ডিজাইন, বাস্তবসম্মত গতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত লাইসেন্সিং, ফিটনেসে শূন্য ছাড়, শ্রমঘণ্টার ন্যায্যতা, পথচারীর অধিকার, স্কুল-হাসপাতাল এলাকার বিশেষ সুরক্ষা, দ্রুত ট্রমা সেবা এবং সবচেয়ে জরুরি জবাবদিহি।
আজ সবাই যে উদাসীনতা দেখাচ্ছি, কাল সেই উদাসীনতা আমাদেরই দরজায় এসে দাঁড়াতে পারে। সড়কে মানুষ মারা যাচ্ছে, এটা শুধু তাদের গল্প নয়; আমাদের সমাজের চরিত্রের বিকলাঙ্গতা, যা নিয়ে ভবিষ্যৎ কথা বলবে।
ইকরাম কবীর: গল্পকার; যোগাযোগ
পেশায় নিয়োজিত
- বিষয় :
- ইকরাম কবীর
