জন্মদিন
সমাজ গঠনে এক জীবন
অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান
সুমন সরদার
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জনপ্রশাসন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন। ঢাকায় জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক ছিলেন। তিনি স্বাধীনচেতা ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তাঁর জন্ম মাদারীপুর জেলাধীন কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ ও আনন্দমোহন কলেজে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু।
অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি মাদারীপুর সরকারি কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, নরসিংদী সরকারি কলেজ ও টাঙ্গাইলের সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশনে প্রধান প্রতিবেদক সম্পাদক হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন। অবসর গ্রহণের পর আসাদুজ্জামান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে শহীদ বীরউত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। এনসিটিবির সচিব এবং কিছুকাল তিনি এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় প্রচলিত কলোনিয়াল প্রথা, বৈষম্য ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সরকারের কাছে প্রায় ৫০ বছর আগে এ লক্ষ্যে যেসব প্রস্তাব তুলে ধরেন, তার মধ্যে– প্রতিটি জেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির শাসন কায়েম; রাষ্ট্র স্বীকৃত নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রবর্তন; জনস্বার্থে প্রশাসন থেকে বিচারিক ক্ষমতা পৃথককরণ; জাতীয় সার্ভিস সিস্টেমকে দুইশ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার মানসে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সমমান ও সমমর্যাদায় (ইকুয়াল র্যাংক অ্যান্ড স্ট্যাটাস) বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্যাডার সার্ভিস গঠন। এ প্রস্তাবের অনেক কিছুই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক গৃহীত হওয়ায় দেশের মানুষ উপকৃত।
প্রশাসন সম্পর্কিত তিনি যে সংস্কার প্রস্তাব দেন, সেটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গোচরীভূত হয়। তাঁর নির্দেশে তৎকালীন কেবিনেট সচিব মাহাবুবুজ্জামান জেলা সমন্বয়কারীর পদ সৃষ্টি এবং মন্ত্রণালয়ের জন্য সমমান ও সমমর্যাদায় বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক অর্থাৎ ২৪টি ক্যাডার সার্ভিস গঠন করেন। যেমন– সিভিল সার্ভিস- কৃষি, সিভিল সার্ভিস- হেলথ, সিভিল সার্ভিস- শিক্ষা, সিভিল সার্ভিস- পুলিশ, সিভিল সার্ভিস- পূর্ত, সিভিল সার্ভিস- বিচার ইত্যাদি। এ বিষয়ে তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো ও সিস্টেমের রূপান্তর: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’। লেখকের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’ প্রকাশিত হয়। ‘কোন চৈত্র মাসে বনের ঘাসে মনের কথার টুকরো আমার কুড়িয়ে পাবে কোন উদাসীন, সেই প্রত্যাশা নিয়েই তাঁর কবিমন অবিশ্রান্তভাবে গেঁথে গেছে এই স্মৃতিকথার মালা’।
অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের উদ্যোগে নিজ গ্রামে ‘এইচএন বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপিত হয় বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সত্তর ও আশির দশকে ‘কবি নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর আসাদুজ্জামান কলেজের উন্নয়নধারায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এডিবি ভবন, আইসিটি ভবন এবং একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের এখন সুদীর্ঘ ৯৩ বছরের জীবন। ১৯৩৩ সালে জন্ম নিয়ে তিনি ব্রিটিশ শাসন দেখেছেন; পাকিস্তান আমলে কর্মজীবন শুরু করেছেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাসহ দেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি পরিশীলিত সমাজ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির স্বপ্ন দেখেন এই বয়সেও।
ইংরেজ কবি শেলির স্কাইলার্ক পাখির মতো তিনি তাঁর প্রীতিসিক্ত দৃষ্টি নিরন্তর নিবদ্ধ রেখেছেন গ্রামীণ স্নিগ্ধ শ্যামল মাটি আর মানুষের দিকে। আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুভেচ্ছা জানাই।
সুমন সরদার: কবি ও প্রাবন্ধিক
- বিষয় :
- জন্মদিন
