ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

খালেদা জিয়ার মহাকাব্যিক বিদায়

খালেদা জিয়ার মহাকাব্যিক বিদায়
×

মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের আকাশ কদিন থেকেই ধূসর ছিল; সূর্যের দেখা নেই। প্রকৃতি সম্ভবত অনেক কিছুই আগাম জানিয়ে দেয়, মানুষ বুঝতে পারে না। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে খালেদা জিয়ার কোনার বেডটা সেদিন রাতে আলো-আঁধারির মায়ায় নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো সকাল থেকেই এলোমেলো; বারবার জানান দিচ্ছে– সময় বেশি নেই। শীতের তীব্রতায় ভোঁতা অনুভূতিগুলো বুঝতেও পারছে না কী মর্মান্তিক খবর অপেক্ষা করছে।

আট দশক আগে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীর তৈয়বা ভিলার সামনের ছোট্ট সবুজ লনে এক্কাদোক্কা খেলতেন কিশোরী পুতুল। বেণী দুলিয়ে বাড়ির সামনের গার্লস স্কুলে যাবার পথে জলপাই রঙের জিপে কেতাদুরস্ত ক্যাপ্টেন জিয়ার সানগ্লাস পরা চোখে তিনি আটকে যাবেন– কে জানত! 

জন্মের এক বছরের মাথায় উপমহাদেশ ভাগ হয়েছিল ভারত-পাকিস্তানে; অষ্টাদশের গণ্ডি পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে পঁয়ষট্টির যুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কোয়ার্টারে যুদ্ধের সময়টা একাকী কাটিয়েছেন যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর মঙ্গল কামনায়। দিনাজপুরের ছোট্ট বাড়িটা বারবার হাতছানি দেয়। বদলির খবরে আকাশছোঁয়া আনন্দ নিয়ে জন্মভূমিতে ফেরত। ততদিনে কোলজোড়া তারেক রহমান; পরপরই আরাফাত রহমান। আদরের পিনো ও কোকো। 

সবাই তখন চট্টগ্রামে; একাত্তরের শুরু দেশজুড়ে আন্দোলন দিয়ে। এরই মাঝে আবার বদলির খবর পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বামী তখন তরুণ মেজর; মাঝে মাঝেই অন্য অফিসারদের আনাগোনা বাসায়। বুঝতে পারেন, বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ২৫ মার্চের বিকেল হন্তদন্ত হয়ে বাসায় এক সৈনিক: ‘ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি অফিসার এসেছে আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে যেতে।’ খালেদা বললেন, ‘স্যারকে না বলে ওগুলো দেবেন না।’ সেদিন পাকিস্তানিরা অস্ত্রগুলো নিতে পারেনি। 

সে রাতে স্বামী ঘরে ফেরেননি। খবর পেলেন, সারাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরীহ দেশবাসীর ওপর। শুরু হয়েছে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। শুনলেন– রেজিমেন্টে বিদ্রোহ হয়েছে; নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই স্বামী। রেজিমেন্ট-প্রধান কর্নেল জানজুয়া নিহত স্বামীর হাতে।

পরদিন রেডিওতে স্বামীর কণ্ঠে শুনলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। একদিকে গর্ব হচ্ছে অকল্পনীয়, আবার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়। হালকা অভিমানও; একবার বলে গেলে কী হতো! মাসের শেষ; হাতে তেমন টাকাও নেই। খবর পাচ্ছিলেন, জিয়ার বাহিনী কালুরঘাটে লড়ছেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। মেজর জিয়া তখন সারাদেশে পরিচিত নাম; দুই শিশুকে নিয়ে একাকী খালেদা বুঝতে পারলেন, দেশ স্বাধীন হলেই স্বামীর দেখা পাবেন, নইলে কোনোদিনই নয়। 

শুরু হলো গন্তব্যহীন যাত্রা; আজ এখানে কাল ওখানে। জুলাইয়ে একদিন ধরা পড়লেন পাকিস্তানিদের হাতে; সবাই একসঙ্গে। ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি রইলেন দুই শিশুপুত্র নিয়ে ডিসেম্বরের বিজয় অব্দি।
বিজয়ের পর ঘরে ফিরলেন জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়া। কষ্টের ৯ মাস তাদের কেমন কেটেছে, সেটাও বলার সময় যেমন হলো না, তেমনি শোনা হলো না যুদ্ধের বীরত্বগাথা। তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিং, কামালপুরের যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল রৌমারী, সিলেটের সালুটিকর আর শমশেরনগরের যুদ্ধ, সিলেট মুক্ত করার গল্প, যমুনার চরে খোলা আকাশের নিচে রাতের পর রাত কাটানোর গল্পগুলোও শোনা হলো না।

যোগ্যতা আর প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেনাপ্রধান না হওয়ার আক্ষেপ শুনলেন না স্বামীর কাছে। কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের স্ত্রী হয়ে। দেশে তখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ। চারদিকে গুমোট বাতাবরণ। পঁচাত্তরের আগস্ট-নভেম্বরে দেশে নতুন ক্রান্তিকাল। শেষ আগস্টে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেলেও এক পর্যায়ে পরিবারসহ গৃহবন্দি। হঠাৎ সৈনিকদের গগনবিদারী উল্লাস আর একাত্তরের মতো আরেক ক্রান্তিলগ্নে জাতির দিশারি জিয়াউর রহমান। 

এরপর সেনাপ্রধানের স্ত্রী, প্রেসিডেন্টের স্ত্রী; কিন্তু রইলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। স্বামীর জনপ্রিয়তার গল্প মানুষের মুখে মুখে; কিন্তু নিজে সেটার অংশ হতে পারেন না। আটপৌরে গৃহবধূর জীবন কাটে সন্তানদের নিয়ে। প্রেসিডেন্টের খাবার টেবিলে রেশনের মোটা চাল, সবজি-ডাল, ছোট মাছ, কদাপি মুরগির ঝোলে। ছেলেদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাবার পুরোনো শার্ট-প্যান্ট নিজেদের মাপে বানিয়ে নিয়ে। মাঝে মাঝে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে জনসমক্ষে যেতে হয়। বরাবরের মতো সলজ্জ নিরাভরণ, কিন্তু সেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অপরূপ ঔজ্জ্বল্যের দ্যুতি ছাপিয়ে যায় সবকিছু। 

আবার হঠাৎই আঘাত। ৮১ সালের ২৯ মে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন জিয়া। রাতে ফোনে জানিয়েছেন, ফিরছেন সকালেই। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের সকাল আর কোনোদিনই এলো না। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির সেই রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হলেন জিয়া। শুরু হলো অনিশ্চিত দীর্ঘ যাত্রাপথ। স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তখন বিপর্যস্ত। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে এরশাদ ক্ষমতায়। দলের শীর্ষ নেতারা একে একে দল ছাড়ছেন। নেতাকর্মীর ক্রমাগত চাপ এড়াতে পারলেন না। হাল ধরলেন দলের। অনভিজ্ঞ গৃহবধূর জন্য রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে রইলেন কর্মীদের সারিতে। পুলিশের লাঠির আঘাত, গ্রেপ্তার; কিছুই টলাতে পারল না। আন্দোলনের সহযাত্রী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন পথভ্রষ্ট, তখন সবার অজান্তে আপসহীন শব্দটা তাঁর নামের সমার্থক হয়ে উঠল। রইলেন আপসহীন; জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জীবনে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনেই জয়ী হলেন। ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রইল পরের সকল অংশ নেওয়া নির্বাচনে– ৯১, ৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও সবটিতেই নিরঙ্কুশ শতভাগ জয়। এ এমন এক কীর্তি, যা স্পর্শ করে সাধ্য কার! 

একানব্বইয়ের নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রতিশ্রুতি রাখলেন। যে শাসন ব্যবস্থা তাঁকে দিতে পারত বারবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার নিশ্চিত সুযোগ; নির্দ্বিধায় মেনে নিলেন আপাত চ্যালেঞ্জিং সংসদীয় ব্যবস্থা। পরের সুযোগে অবাধ আর সুষ্ঠু ভোটাধিকার নিশ্চিতে প্রবর্তন করলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। পরের মেয়াদে নারীশিক্ষা সহজতর করতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য করলেন সম্পূর্ণ অবৈতনিক। 
এর পর এলো ভয়াবহ এক-এগারো। তছনছ হলো তাঁর দল। বন্দি হলেন অন্যায়ভাবে; দুই সন্তানের ওপর চালানো সীমাহীন নির্যাতনের সাক্ষী হলেন পরম ধৈর্যে। এর মাঝে মাকে হারালেন। নির্যাতনে পঙ্গুত্বের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেককে দেখলেন নির্বাসিত হতে। 

মঞ্চস্থ হতে শুরু করল প্রহসন, একে একে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ১৮ সালে নিশি-রাতের নির্বাচন, ২৪ সালে আমি-ডামির নির্বাচন।
ওদিকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর মুখোমুখি হলেন অমানবিক হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার। জগতের সকল অনাচারকে লজ্জায় ফেলে তখনকার কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী সৃষ্টি করলেন জিঘাংসার নতুন উদাহরণ। স্বামী-সন্তান আর দীর্ঘ সংসারের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো অমানবিকভাবে।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার রোষানলে পড়লেন; মিথ্যা মামলায় পাঠানো হলো নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন কারাবাসে। পরিত্যক্ত, অস্বাস্থ্যকর, জনমানবহীন সেই নির্জন কারাবাসের একমাত্র সঙ্গী পরিচারিকা ফাতেমা। তার সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন আহার্য, সময় ও প্রক্ষালন কক্ষ। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রীর কী মর্মান্তিক জীবনযাপন! কারাবাসে গেলেন সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ; ফিরলেন লিভারের দুরারোগ্য অসুখ নিয়ে।

বছরের পর বছর রইলেন চিকিৎসাবঞ্চিত। বারবার শিকার হলেন অশ্লীল আর কদর্য বাক্যবাণে। দেশের বরেণ্য চিকিৎসকরা সেবা দিলেন সাধ্যমতো; নিজেদের জ্ঞান আর শ্রদ্ধা উজাড় করে। 
শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার ও দল আওয়ামী লীগ নির্যাতন, মামলা, হামলা, গুম, খুন আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মহোৎসব চালিয়ে নিজেদের যখন অজেয় ভাবতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই বিস্ফোরণ হলো আগ্নেয়গিরির। ১৭ বছর ধরে পুঞ্জীভূত বঞ্চনা, ক্ষোভ আর ক্রোধকে একীভূত করে। এই সুদীর্ঘ সময় তাঁর অবর্তমানে প্রবাস থেকে বিচক্ষণতার সঙ্গে দলের হাল ধরে আন্দোলনকে সাফল্য দিতে প্রধান সেনাপতির ভূমিকা রাখলেন পুত্র তারেক রহমান। শেখ হাসিনা ও তাঁর সাগরেদরা জনরোষ থেকে প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। সকল অহংকার বিচূর্ণ হলো এক পলকে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তখন আর শুধু দেশনেত্রী নন; কৃতজ্ঞ জাতির অভিভাবক– দেশমাতা। 

বিজয়ী বাংলাদেশে তিনি মুক্ত হলেন সকল অন্যায় মামলা থেকে। প্রথমবারের মতো বিদেশে গেলেন উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায়। ততক্ষণে দেরি হয়েছে অনেক। লিভার প্রতিস্থাপন ততদিনে আর নিরাপদ নয় তাঁর জন্য। ফিরলেন দেশে, কিন্তু স্বৈরাচারের দেওয়া নিষ্ঠুর অসুস্থতা তাঁকে বারবার টেনে নিল হাসপাতালের শয্যায়।
২৩ তারিখে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট আবারও টেনে নিল হাসপাতালে। একের পর এক জটিলতাগুলো তাঁর বাড়ি ফেরা বিলম্বিত করছিল। এদিকে পুত্রের দেশে ফেরার সময় ঘনিয়ে এলো। অবস্থার উন্নতি-অবনতি তখন সময়ের সুতোয় বাঁধা। পুত্র-সান্নিধ্যের প্রতীক্ষার শেষ হলো ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। পুত্রের হাতের ছোঁয়ায় মায়ের মুখে হাসি। 

কয়েকদিন পর, কনকনে শীতের দীর্ঘ রাতও শেষ হয়ে আসছে। আলো ফুটলেই ডিসেম্বর ৩০। এভারকেয়ারের আইসিইউতে তখন হিমশীতল নীরবতা। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো ক্লান্তিতে এলোমেলো। শক্ত করে ধরে রাখা পুত্রের হাতের স্পর্শ ধীরে ধীরে অনুভূতির দেয়াল পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে। ভেসে আসছে ফজরের আজান। কুয়াশাঘেরা জিয়া উদ্যানে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা প্রিয়তম; পাশে অনন্ত নিদ্রার আহ্বান।

পরদিন দূর আকাশ থেকে তিনি দেখবেন, কনকনে শীতের তীব্রতা কমাতে সূর্য তার সবটুকু উষ্ণতা নিয়ে হাজির। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে জনতার স্রোত ঢাকার রাজপথ এমনকি অলিগলিকেও অভিমানী রাখেনি। প্রত্যেককে ভরিয়ে দিয়েছে কানায় কানায় অগণিত গুণমুগ্ধে। শুধু ইতিহাস দিয়ে এর পরিমাপ অসম্ভব; রাজনীতি, সভ্যতা আর ত্যাগের এ এক জীবন্ত মহাকাব্য। 
কথা রেখেছেন দেশমাতা– এ দেশের বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই।

অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল: আহ্বায়ক, বিএনপির মিডিয়া সেল

আরও পড়ুন

×