ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

যেমন প্রতিনিধি চাই

যেমন প্রতিনিধি চাই
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনের সময় যে প্রশ্ন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায় তা হলো, আমরা কেমন প্রতিনিধি চাই? আমরা কি নেতা নির্বাচিত করতে চাই, নাকি খেদমতকারী? কত দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি প্রার্থী বাছাই করতে! আবার ভোট শেষ হওয়ার কিছুদিন পর ওই পছন্দের মানুষকেই ফেলে দিই অপছন্দের পাল্লায়। দোষটা নির্বাচিত জনের, নাকি আমাদের?

সমাজ ও জাতি গঠনে পরম্পরা একটি বড় উপাদান। পরম্পরায় ইতিবাচকতা থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেমুখীই হবে; অন্যথায় বিপরীত। আধুনিক যুগে ইলেকট্রনিক মাধ্যম যথা টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন– এই পরম্পরা সৃষ্টি আরও দ্রুততর করে তুলেছে। সারাজীবন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, আমাদের সিনেমা, নাটক, গল্প কিংবা সামাজিক মাধ্যমে তৈরি কনটেন্টে জনপ্রতিনিধিরা চিহ্নিত হন মন্দ মানুষ হিসেবে। সমাজের যত মন্দ কাজ, নাটক-সিনেমায় তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আমরা কেন যেন বেছে নিই একজন জনপ্রতিনিধিকে বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের। ফলে বাস্তব জীবনে জনপ্রতিনিধিরা ভালো-মন্দ যা-ই হোন না কেন, সাধারণ মানুষের ভাবনায় তাদের ঠাঁই হয় মন্দ মানুষের পাল্লায়।

একটি বিজ্ঞাপনচিত্র প্রায় সব সময় প্রচারিত হলেও নির্বাচনের আগে আগে সেটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বিজ্ঞাপনটি একটি কনডেন্সড মিল্কের। তবে নির্বাচনের আগে সন্দেহ জাগে– রাজনৈতিক কিনা! বিজ্ঞাপনচিত্রে একজন জনপ্রিয় অভিনেতা চা-ওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেন। শহর, গ্রামগঞ্জে চায়ের স্টল যেমনটি হয়, তেমনই। ছাপরা টংঘর। স্টলের সামনে খান দুই বেঞ্চ, খদ্দেরদের বসার জায়গা। হাতি মার্কা নিয়ে একজন প্রার্থী স্টলে এসে চা-ওয়ালার কাছে ভোট চাইলে শুরু হয় ভোটপ্রার্থীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সমালোচনা। নির্বাচনে যারা প্রার্থী তাদের ভোট দেওয়া যায় না। তাহলে কাকে দেওয়া যায় ভোট! একজন বলে ওঠে তোমাকে, মানে চা-ওয়ালাকেই। তাঁর মতো সৎ, উপকারী ও ভালো মানুষ আর কোথায় পাওয়া যাবে? ফলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে চায়ের স্টলের চা বিক্রেতা হয়ে যান কমিশনার পদপ্রার্থী। প্রার্থিতা ঠিক হওয়ার আগে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চা-ওয়ালা বলেন, যেমন আমরা তেমনি আমাদের মার্কা! অথচ তাচ্ছিল্য ভুলে তিনি নির্বিকারভাবে সেই বিরাজমান মার্কারই একটায় প্রার্থী হয়ে যান।
এই বিজ্ঞাপনচিত্র যেন আমাদেরই সমাজচিত্র। যারা প্রার্থী হন তাদের আমরা পছন্দ করি না। আমরা তাদের মধ্যে প্রতিচ্ছবি দেখি শুধুই ভিলেনের। সৎ, শিক্ষিত, জনহিতৈষী প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত কেউ প্রার্থী হলেও আমরা হতাশায় ভুগি। এই হতাশা থেকে নিষ্কৃতি পেতে আমরা কখনও কোথাও আস্থা রাখি পার্টটাইম বাবুর্চি, পালাগানের শিল্পী কিংবা রিকশাচালকের ওপর। কনডেন্সড মিল্কের বিজ্ঞাপনচিত্রটি যেন আমাদের নির্বাচনেরই চিরন্তন চিত্র।

নানামুখী পরিবর্তনের সওগাত নিয়ে এসেছিল জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী অভ্যুত্থান। প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের। প্রতিশ্রুতি ছিল যোগ্য মানুষের শাসন ও যোগ্য ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বের। অতীতে অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন নিয়ে। আপত্তি উঠত জনবিচ্ছিন্ন মানুষের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে। চব্বিশ সুবাতাসের স্বপ্ন দেখালেও ডজন ডজন আসনে প্রার্থিতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ। একেবারেই অসন্তোষ নেই এমন আসনের সংখ্যা হাতের আঙুলেই গুনে ফেলা যায়। 

সংস্কার হলো ভূরি ভূরি। একজন কদ্দিন প্রধানমন্ত্রী পদে থাকবেন; প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় দলনেতা হতে পারবেন না; মার্কিনি ধাঁচে এসব হলেও হলো না মার্কিনি ধাঁচে প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যবস্থা; যে ব্যবস্থায় পার্টির তৃণমূলের কর্মীরাও অংশ নেন প্রার্থী বাছাইয়ে। সে ব্যবস্থা হলো না বলেই টিকে যায় ঘন দুধের বিজ্ঞাপন। জনগণ খুশি হয় এটা শুনে– ‘এক কাপ চা-ই যদি না খাওয়াইতে পারলাম, কমিশনার হয়ে কী করুম!’ তাহলে কি আমরা নীতিনির্ধারক চাই না? পথপ্রদর্শক চাই না? দিন শেষে এক কাপ চা খাওয়াই আমাদের মোক্ষ। আমরা সাফাই গাই– পালাগানের গায়িকা যদি সংসদ সদস্য হতে পারেন তবে কেন রিকশাচালক নয়! কী অদ্ভুত স্ববিরোধিতা! স্ববিরোধিতা যেমন নেতাদের, তেমনি ভোটারেরও। কমিশনই-বা নিশ্চুপ থাকে কেন! তাই দলের নিবন্ধন থাকলেই দলের মার্কায় যে কেউ প্রার্থী হতে পারলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা বিস্তর। তখন আবার প্রার্থী ও ভোটারের কাছে কনডেন্সড মিল্কের বিজ্ঞাপনটি ফিকে হয়ে যায়।

রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী জেলা-উপজেলায় কমিটি থাকে, সদস্য থাকে। তা-ই যদি থাকে তাহলে সংস্কারের ডামাডোলে অতীতের মনোনয়ন বাণিজ্যের অপবাদ ঘোচাতে প্রার্থী মনোনয়নে পরিবর্তন আসতে পারত। নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্তরের পার্টি কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত নেতা হতে পারতেন দলীয় প্রার্থী। তাতে বিলুপ্ত হতো মনোনয়ন বাণিজ্যের কিংবা চাপিয়ে দেওয়া মনোনয়নের অপবাদ। দলের সর্বস্তরের সদস্যরা হতেন মর্যাদাবান। হয়তো লোপ পেত মনোনয়ন-পরবর্তী বিরোধ ও কোন্দল। আর যদি বজায় থাকে সাবেকি মনোনয়ন পদ্ধতি, তাহলে যত সংস্কারই হোক না কেন, শেষ ফল যেই লাউ সেই কদু। এক কাপ ভালো চা বানিয়ে খাওয়ানোর মতো নয়; সংসদে গান গেয়ে মাতিয়ে রাখার মতো নয়; দ্রুতগতিতে রিকশা চালিয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমরা এমন কাউকে নির্বাচিত দেখতে চাই না, যিনি সংসদীয় বক্তৃতার ধরন-ধারণ না জেনে হয়তো বলে বসবেন, ‘অনেক বিলই তো পাস করলাম মাননীয় স্পিকার, আমার পার্সেনটেজ কই?’  

আমাদের চাওয়া সংসদে তিনি আসবেন, যিনি আমাদের সুষম বাজেট প্রণয়নে সহায়তা দেবেন; অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম করার দিকনির্দেশনা দেবেন। অন্য দেশের আইনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমার দেশের আইন বানাবেন। আমাদের বিদ্যমান আইনকানুনের যুগোপযোগী সংস্কারে ভূমিকা রাখবেন, যিনি বিদেশের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেন। যিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত হবেন তিনি গণমানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে পথ তৈরি করে দেবেন। পানীয় জল, বর্জ্য নিষ্কাশন, অভ্যন্তরীণ চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনবেন। যার দেখা স্বপ্নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, বৈদেশিক সম্পর্ক, শিক্ষা, পরিবেশ, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনসহ নানাবিধ ক্ষেত্রে। সেই সব বদলে দিতে পারার শক্তিমান মানুষজনকে পেতে চাই আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে।         

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×