ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিরলপ্রজ সুকুমার বড়ুয়া

বিরলপ্রজ সুকুমার বড়ুয়া
×

সুকুমার বড়ুয়া

আনিসুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

শৈশবে স্কুলজীবনে সুকুমার রায় আর সুকুমার বড়ুয়া এই দুই নামের সঙ্গে তালগোল পাকাতে পাকাতেই জেনে গিয়েছিলাম সুকুমার রায় গত হয়েছেন অনেক আগেই। সুকুমার বড়ুয়া বেঁচে আছেন; চাকরি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ রকম ধারণা পেয়েছিলাম মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক বিশেষ করে বিধুভূষণ মজুমদার এবং বাহাজ উদ্দিন ফকিরের কাছ থেকে। 

বিদ্যালয়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে মৌসুমি প্রতিযোগিতার নানা পর্যায়ে আবৃত্তি বিভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্‌দীন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, আবদুল হাকিম, সুফিয়া কামাল, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের কবিতার সঙ্গে সুকুমার রায়, সুকুমার বড়ুয়া এবং এখ্লাসউদ্দিন আহ্‌মদের ছড়াও থাকত।  
আবৃত্তি প্রতিযোগিতার সময় আমার শিক্ষকরা কবিদের জীবন নিয়ে নানা গল্পও করতেন। এ ছাড়া বাংলা পাঠদানের সময়েও লেখকদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে নানা গল্প আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে শোনার সুযোগ পেতাম। এসব গল্পের ভেতরেই সুকুমার বড়ুয়ার প্রসঙ্গ এসেছিল।  

এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুবাদে সুকুমার বড়ুয়াকে অনেকবার কাছে থেকে দূরে থেকে দেখেছি। যতদূর মনে পড়ে, তিনি পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে অনেকটা গল্পের চরিত্রের মতো ধীর পায়ে হেঁটে চলতেন। এ রকম অবস্থায় অনেকবার তাঁকে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের পুষ্টিবিজ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের রাস্তায়। কিন্তু কেন জানি তাঁর সঙ্গে কোনোদিন আলাপ করা হয়ে ওঠেনি। একবার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্টিবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভেতরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেসও করেছিলাম– ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া কি আছেন? দুর্ভাগ্য, সেদিন তিনি ওখানে ছিলেন না। এরপর বারোয়ারী ব্যস্ততায় সুকুমার বড়ুয়ার কাছে যাবার সুযোগ পাইনি। শেষতক সুজনদা মানে কবি সুজন বড়ুয়াকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে ইচ্ছেটা জানালে তিনি জানালেন, সুকুমার বড়ুয়া চট্টগ্রামের রাউজানে তাঁর গ্রামের বাড়িতে স্থিত হয়েছেন। সিদ্ধান্ত নিলাম, সময়-সুযোগ করে আমরা সুকুমার বড়ুয়ার গ্রামের বাড়িতেই যাব। সেই সুযোগ হয়ে ওঠার আগেই তিনি পরপারে চলে গেলেন গত ২ জানুয়ারি।

সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন চট্টগ্রামের খেটে খাওয়া প্রান্তিক পরিবারের সন্তান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস সহকারীর চাকরিতে ঢোকার আগে মুটে-মজুর এবং ফুটপাতে বাদাম ও ফল বিক্রির কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের হাতে গোনা গুটিকয়েক স্বশিক্ষিত প্রতিভা হিসেবে লালন ফকির, আরজ আলী মাতুব্বরের মতো বিরলপ্রজদের তালিকায় সুকুমার বড়ুয়ার নামটিও অবধারিতভাবে উচ্চারণ করতে হবে। 

সুকুমার বড়ুয়ার একক গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের বেশি। প্রায় সবকটিই ছড়াগ্রন্থ। ‘চন্দনার পাঠশালা’ নামে সাতটি গল্পের এক বই প্রকাশ করেছিলেন। সুকুমার বড়ুয়া যেন নিজের শৈশবকে চন্দনার গল্পে মেলে ধরেছেন। যুক্ত বর্ণ নিয়ে ছোটদের জন্য অভিনব এক বই লিখেছেন। সম্পাদনার কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘মধুমাছি খেলাঘর আসর’ নামে শিশুদের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন তিনি।   

২০ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেছিলেন সুকুমার বড়ুয়া। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ করেন ১৯৭০ সালে। বইটির নাম ‘বৃষ্টি নেমে যায়’। এরপর নিরলস লিখে গেছেন শত শত ছড়া। ছড়াই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। ছড়ার ভেতরে ছিল তাঁর জীবনদর্শন, রাজনীতি, ইতিহাস, সময়, সমাজ ও পিতৃভূমি। সরল-সহজ পরিশীলিত উদার জীবনের অধিকারী নিজের দেখা জীবন ও সময়কে যত্ন করে কৃত্রিমতা ছাড়া ছড়ার পর ছড়ায় তুলে ধরেছেন। 

তাঁর লেখালেখির ব্যাপ্তিকাল ছয় দশকের মতো; বাংলাদেশের বয়সের চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে মনে হবে, ছড়াই তো পড়ছি। নির্মল ছড়া। কিন্তু একটু গভীরে গেলে মনে হবে, ইতিহাস কথা বলছে; জীবন ও সময়ের বাঁকগুলো তুলে ধরছে। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া ছোটদের জন্য লেখা হলেও তা সব বয়সের পাঠকের উপযোগী। শিশুমনের তাগিদ ও কল্পনার স্বাধীনতার চূড়ায় আরোহণের রহস্য সুকুমার বড়ুয়া ঠিকভাবে উদ্ঘাটন করেছিলেন। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গির তাবৎ লেখাজোখা হাস্যরস, ব্যঙ্গাত্মক আর নৈতিক শিক্ষার দারুণ এক পাঠশালা।  
ছয় দশকের লেখালেখির সময়ে তাঁর পিতৃভূমিতে ঘটে গেছে একের পর এক ঘটনা, উত্থান আর পতন, ক্ষমতা ও রাজনীতির মারমার কাটকাট মুহূর্ত। এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করে তিনি দায়বদ্ধ থেকেছেন জীবন ও সত্যের কাছে। চেতন-অবচেতনে স্বতঃস্ফূর্ত গতিতে কলম ধরেছেন নিপীড়িতের পক্ষে। দেশপ্রেম আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর পক্ষপাত ছিল আজন্ম, যদিও রাজনীতির ধারেকাছে ভেড়েননি কখনও। এই জনপদ, ইতিহাস, ভাষা আর ইতিহাস যতদিন থাকবে, সুকুমার বড়ুয়ার আসনটি ততদিন অক্ষুণ্ন রয়ে যাবে।

আনিসুর রহমান: সুইডেনপ্রবাসী কবি ও নাট্যকার
[email protected] 

আরও পড়ুন

×