ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জন্মদিন

ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক

ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক
×

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ (১৯১১-১৯৭৯)

হাসনাত আরিয়ান খান

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হওয়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিদের একজন। তিনি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতিবিজড়িত মুর্শিদাবাদের এক সন্ত্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র। স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিতে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এর পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই ১৯৩০ সালে অর্থনীতিতে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এরপর ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বিলেতের লিংকনস্‌ ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ সম্পন্ন করেন। ওই বছর ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে বার অ্যাট ল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেছিলেন। 
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ ১৯৫৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। আইনজীবী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও তিনি দক্ষ বিচারক হিসেবে আকাশছোঁয়া খ্যাতি পেয়েছিলেন। তিনি নিছক আইনশাস্ত্র অনুশীলন করে আইনের টেকনোক্র্যাট হননি। আইন তাঁর কাছে কেবল কতগুলো বিধি-ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর জ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসার পরিধি বহুধা বিস্তৃত ছিল। তাঁর আইনশাস্ত্রের পদ্ধতি বাস্তববাদ, সাহসিকতা এবং প্রত্যয় দ্বারা চিহ্নিত ছিল। তাঁর মহিমা, দৃঢ় বুদ্ধি এবং দিগন্তের ওপারে দেখার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি আইন ইতিহাস মাপকাঠিতে, দর্শনের তুলনামূলক বিচারে ওজন করে নিতে পারতেন। আইনের পেছনে যে ইতিহাস, সমাজ ব্যবস্থা ও দর্শন বিদ্যমান, তিনি তার মূলে সহজে ও অবাধে বিচরণ করতে পারতেন। সব ধরনের লোভ-লালসা ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে তিনি বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। 

প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারব্যবস্থার মর্যাদা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। এ কারণে তিনি দলীয় রাজনীতিতে কখনও জড়াননি। দলীয় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করেননি। বিচারকের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য তিনি কঠোর প্রয়াস চালিয়েছিলেন। একজন বিচারক হিসেবে তিনি তাঁর আজীবন স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শ্রেষ্ঠত্বের আদর্শে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিম্ন আদালতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন, অগ্রগতি ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তিনি নিজের নিরলস প্রচেষ্টায় পদে থাকার মাত্র চার বছরের মধ্যে বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। সমাজের মৌলিক বাস্তবতা এবং আমাদের প্রেক্ষাপটে কীভাবে আইন পরিচালনা ও প্রয়োগ করা উচিত তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করতে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি হাইকোর্ট থেকে সুয়োমোটো/স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেছিলেন। নির্বাহী ক্ষমতা খর্ব করতে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে তিনিই প্রথম উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন চালু করেছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ তাঁর মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তাঁর মামা দুজনেই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান-সংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। এই মহান ব্যক্তিত্ব ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ জন্মদিনে আমরা বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদকে স্মরণ করি। 

হাসনাত আরিয়ান খান: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×