সমকালীন প্রসঙ্গ
যে সমাজে মানুষ মরতে চায়
ইকরাম কবীর
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিদিন যদি গড়ে ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, তাহলে বছরে হয় ১৪ হাজার ৬০০ জন। হ্যাঁ, আমাদের দেশেই বছরে এত মানুষ নিজেদের মেরে ফেলছেন। গত ২৩ ডিসেম্বর প্রথম আলো খবরটি ছেপেছে। আমার কাছে এ তথ্য শুধু শিরোনামে ছাপা হওয়ার মতো একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের সমাজের শব্দহীন এক চিৎকার। আমরা খবর দেখি-পড়ি, একটু কেঁপে উঠি, আহা-উহু করি, তারপর চা-কফি পান করতে করতে আবার নিজের কাজে মন দিই। এই মানুষেরা কোথায় ব্যর্থ হলেন এবং কেন নিজের জীবনাবসান ঘটালেন? নাকি আমরা সবাই মিলে কোথাও ব্যর্থ হচ্ছি? উত্তর কী হবে? আত্মহত্যাকে আমরা বহু বছর ধরে একটি ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বলে চালিয়ে দিয়েছি, এখনও তা-ই মনে করি। ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ বললে আমাদের সুবিধা হয়, কারণ এতে সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাব্যবস্থা সবাই এসব মৃত্যুর দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, কেউ একা একা আত্মহত্যা করেন না; তাকে ধীরে ধীরে সেই অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়।
আমাদের সমাজে বেঁচে থাকার চাপ প্রচণ্ড, বেঁচে থাকার আনন্দ বা নিরাপত্তা ভয়ানকভাবে কম। কাজ নেই, কাজ থাকলেও সেখানে সম্মান নেই; সম্মান থাকলেও নিরাপত্তা নেই। ঋণ করার পথ খোলা, কিন্তু সেখান থেকে মুক্তির পথ নেই। পরিবার আছে, কিন্তু বোঝাপড়া নেই। মানুষ কথা বলতে চায়, কিন্তু শোনার কেউ নেই। এমন দম বন্ধ করা নীরবতার বিস্ফোরণ এক সময় ঘটে। আত্মহত্যা সেই বিস্ফোরণের শেষ দৃশ্য এবং আমরা শুধু শেষটুকু দেখি, তার আগের গল্পটা শুনতে চাই না।
এ দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। কেউ যদি বলে সে আর পেরে উঠছে না, ক্লান্ত–আমরা তাকে উপদেশ দিই–‘শক্ত হও’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘এত ভেবো না’। কথাগুলো শুনতে বেশ বলদায়ক মনে হতে পারে, তবে এগুলো মানুষের কষ্টগুলোকে অস্বীকার করার এক প্রচেষ্টা বলেই আমার মনে হয়। শারীরিক অসুখ করলে আমরা চিকিৎসক দেখাই, কিন্তু মানসিক সমস্যা হলে আমরা শুধু উপদেশ দিই। মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি মানুষেরা এতে আরও একা হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সে বুঝে যায় যে, কথা বললে দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
আত্মহত্যা শুধু মানসিক রোগের ফল হতে পারে না; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাপে তৈরি ঘটনা। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, সামাজিক অপমান, পরীক্ষার চাপ, প্রেমে ব্যর্থতা, ঋণের বোঝা–সবকিছু মিলে মানুষের মস্তিষ্কে এমন চাপ তৈরি করে, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই। এদের সঙ্গে আগে কথা বললে জানা যেত যে এদের অনেকেই মরতে চায় না; তারা শুধু এই চাপ থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি দেওয়ার ভাষা আমাদের কারও জানা নেই।
নারীর আত্মহত্যার পেছনে সমাজের ভূমিকা আরও ভয়াবহ। এখানে একজন নারীর প্রতি মুহূর্তে, প্রতিদিন বিচার হয়। তার পোশাক, তার কথা, তার সম্পর্ক, তার সিদ্ধান্ত–সবকিছুই আমরা নজরদারিতে রাখি। পারিবারিক সহিংসতা, চরিত্র নিয়ে অপবাদ, সামাজিক লজ্জা–এসব নিয়ে তার কোথাও কারও সঙ্গে কথা বলার উপায় থাকে না। আত্মহত্যা হয়ে ওঠে তার প্রতিবাদের শেষ ভাষা। আমরা কিন্তু তখনও বলি–‘সে মানসিকভাবে দুর্বল ছিল’। আমরা বলি না যে আমরা সবাই মিলে তাকে মেরে ফেলেছি।
পুরুষের আত্মহত্যাও সংখ্যায় অনেক, কিন্তু তা নিয়ে আলোচনা হয় কম। কারণ পুরুষ মানেই শক্ত। পুরুষেরা যে শক্ত, এই ধারণাই তাদের আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে দিতে পারে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে তা স্বীকার করা পুরুষের জন্য এক সামাজিক অপরাধের মতো। ফলে তারা সাহায্য চায় না। নিজের ভেতরে ভাঙতে ভাঙতে একসময় তারা আর কোনো পথ দেখে না। আত্মহত্যা হয়ে ওঠে এক নীরব প্রস্থান।
ধর্ম আর নৈতিকতার কথা বলে আমরা আত্মহত্যা ঠেকানোর চেষ্টা অনেক বছর ধরেই করেছি। কিন্তু যে মানুষটা অসহ্য কোনো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছে, তার কাছে মৃত্যু-পরবর্তী শাস্তির ভয় অর্থহীন। এসব ভয় দেখালে সে আরও বেশি অপরাধবোধে ভোগে। সে মনে করে সে খারাপ, দুর্বল, পাপী। এই অনুভূতি তাকে আমাদের কাছ থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়।
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। আমরা দিবস পালন করি, সেমিনার করি, পরিসংখ্যান প্রকাশ করি কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছুনোর সেবাগুলো কোথায়? মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও শহরকেন্দ্রিক, ব্যয়বহুল এবং সীমিত। স্কুলে, কলেজে, কর্মক্ষেত্রে কাউন্সেলিং নেই। হটলাইন আছে, কিন্তু মানুষ জানে না বা বিশ্বাস করে না। রাষ্ট্র যদি সত্যিই আত্মহত্যা প্রতিরোধে আন্তরিক হতো, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করত।
মিডিয়া আত্মহত্যার খবর এমনভাবে প্রকাশ করে, যা অসংবেদনশীল। কখনও আত্মহত্যার বিস্তারিত বর্ণনা, কখনও নাটকীয় শিরোনাম। মিডিয়ার এমন রিপোর্টিং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয় কিনা, তা ভেবে দেখা দরকার।
আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায় শুধু কাউকে মরতে বারণ করা নয়, বরং এমন একটি সমাজ ও সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা; যেখানে মন খুলে বাঁচতে চায়। এমন সমাজ কি তৈরি করতে পারি, যেখানে ব্যর্থ হওয়াই শেষ কথা নয়, সাহায্য চাওয়া মানেই লজ্জা নয়, কাঁদা মানেই দুর্বলতা নয়?
প্রতিদিন ৪০ জন মানুষের মৃত্যুর অর্থ হচ্ছে, আমরা প্রতিদিন ৪০ জনের কথা শুনতে ব্যর্থ হচ্ছি। ভবিষ্যতে সংখ্যাটা যখন বাড়বে, তখন আমরা হয়তো তা গুনেও দেখব না।
সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
ইকরাম কবীর–গল্পকার ও যোগাযোগ
পেশায় নিয়োজিত।
[email protected].
- বিষয় :
- ইকরাম কবীর
