রাজনীতি
অপরাধের ক্ষেত্র রেখে রাষ্ট্র কেন অপরাধ দমন করতে চায়
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের দেশের কারাগারগুলোতে সাধারণ বন্দিদের অবস্থা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যে খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়। কারাগারফেরত অনেকের মাধ্যমেও কারাবন্দিদের কারাবাস চিত্র পাওয়া যায়। বন্দিদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেও তথ্যগুলো কারাগারের বাইরে এসে থাকে। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের রাষ্ট্র ও কারাগারের সম্পর্কটা কেমন।
দ্বন্দ্বটা রাষ্ট্রের সঙ্গে অপরাধের। অপরাধমাত্রই একটি কার্য বটে; কিন্তু কার্য তো ঘটে না কারণ না থাকলে। তাই রাষ্ট্র যখন বলে, সমাজে অপরাধ থাকবে না, সব অপরাধ নির্মূল করা হবে; তার অর্থ নিশ্চয়ই এই যে, কার্য থাকবে না, কারণও থাকবে না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্র ব্যস্ত শুধু অপরাধের ঘটনা নিয়ে। অপরাধীদের ধরে আনে, শাস্তি দেয়। জেলে ফেলে রাখে। পেছনের কারণটা দেখে না কিংবা দেখতে চায় না। বরঞ্চ বলা যাবে, রাষ্ট্রের কর্তারা কেউ কেউ অপরাধ দেখলে দুঃখিত না হয়ে খুশিই হয়। একাংশ তো অবশ্যই। সেই অংশ, যে অংশ অপরাধ নিবারণের সঙ্গে যুক্ত। স্বার্থ বড়ই কঠিন নিয়ামক। বিবেকহীন।
অপরাধের শাস্তি দাও, অপরাধীকে করুণা করো, এই বাণী ধর্মগ্রন্থে আছে। বাস্তবে ব্যবস্থা ভিন্ন রকম। সমাজে মানুষ অপরাধীকেই ধরে এবং পারলে মারে; সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্সে–যা অহরহ ঘটে চলেছে। রাষ্ট্রও ওই একই কাজ করে। ধরে শাস্তি দেয়। কারাগারে পাঠায়। অপরাধীকে পাকড়াও করা যে সহজ তা নয়; কিন্তু অপরাধের কারণ অনুসন্ধান এবং তার নির্মূলকরণ অবশ্যই কঠিনতর। অপরাধী দেখলে সমাজ তাই চিৎকার করে, রাষ্ট্রও তাই করে, পারলে ধরে আনে। যদিও সবসময় নয়। ওদিকে অপরাধের ক্ষেত্রটা কিন্তু রয়েই যায়। সেখানে নতুন নতুন অপরাধ ও অপরাধীর জন্ম হয়। উপচে পড়ে কারাগার। মান নেমে যায় কারা ব্যবস্থাপনায়।
দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় না। জয় হয় না রাষ্ট্রের। দূর হয় না অপরাধ। রাষ্ট্রের জন্য সেটা বড় রকমের ব্যর্থতা। কেননা রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ অপরাধ দমনে। তার অস্তিত্বের প্রধান শর্তগুলোর একটি হচ্ছে ওই দমন। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেবে, তারা যাতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করবে। এটা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্র সেটা পারছে না করতে। ব্যর্থতা নয়, বলতে হয়, এ হচ্ছে অপরাধ। রাষ্ট্র অপরাধী হয়ে পড়ে নাগরিকদের কাছে। কেননা অপরাধ তো কমছেই না, বরঞ্চ কেবলই বাড়ছে। যে রাষ্ট্রে যত বেশি অপরাধ, সে রাষ্ট্রে তত বেশি অপরাধী। সমাজে আমরা পাপ-পুণ্যের কথা শুনি। সেটা ভিন্ন ব্যাপার। পাপ-পুণ্য ব্যক্তিগত। অপরাধ বিষয়টা কিন্তু সামাজিক। পাপ করলে শাস্তি ঈশ্বর দেবেন কিংবা ব্যক্তি নিজেই দেবে নিজেকে, পীড়িত হবে বিবেকের কশাঘাতে। অপরাধের শাস্তির জন্য ঈশ্বর কিংবা ব্যক্তিগত বিবেকের ওপর নির্ভর করা যায় না; সেখানে সমাজকে এবং সমাজের কর্তৃপক্ষ যে রাষ্ট্র তাকে ডাকতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্র পারে না।
মানুষ অপরাধ কেন করে, সে প্রশ্নের দিকেও তো তাকাতে হবে, নইলে অপরাধ নির্মূল করা যাবে কী করে? মানুষের মধ্যে একটি ইতর প্রাণী আছে। সেই প্রাণীটি বড়ই স্বার্থপর, যে অন্যেরটা ছিনিয়ে নিতে চায়, হিংসা করে, কাতর হয় ঈর্ষায়। পীড়ন করে দুর্বলকে। অপরাধের বীজ রয়েছে ওই স্বভাবের ভেতরেই। সেটা ঠিক। ঠিক এটাও যে, মানুষের মধ্যে মহত্ত্বও রয়েছে। সেই মহত্ত্বকে বিকশিত করার জন্যই সমাজ। পরিবারই প্রথমে দায়িত্ব নেয়। পরিবার সমাজেরই অংশ, সমাজ দ্বারাই সে নিয়ন্ত্রিত। আর রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে আইন, আছে আইন প্রয়াগের ব্যবস্থা। সমাজ যদি মানুষকে মানুষ করে না তোলে, তবে সে অপরাধী, রাষ্ট্রও অপরাধী সেই সঙ্গে।

দুষ্ট ব্যক্তিটি অপরাধ করেছে, ধরা পড়েছে, প্রমাণ হয়েছে, সাজা পেয়েছে, এখন সে থাকবে কারাগারে। যারা তাকে আটকে রাখছে, তাদের মধ্যে একটা প্রতিহিংসাপরায়ণতা যে কাজ করে না, তা নয়। করে। তারা নিজেদের উন্নত মনে করে। আশা করে শাস্তি দেওয়ার ফলে অপরাধ কমবে। যে ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে, সে আর ওই পথে যাবে না। ভয়ে। অন্যরা দেখে শিখবে। অপরাধ করা থেকে দূরে থাকবে।
আশা থাকে সংশোধনেরও। কয়েদি যখন ছাড়া পাবে, তখন সে বেরিয়ে আসবে উন্নত মানুষ হিসেবে। বাস্তব ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে না। জেলখানা সংশোধনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না। বরঞ্চ উল্টো দায়িত্ব পালন করে। কয়েদির গায়ে এমন দুরপনেয় ছাপ মেরে দেয় যে, সে যখন বেরিয়ে আসে, তখন উন্নত নয়, অবনত হয়েই বের হয়। সমাজে সে সম্মান পাবে আশা করে না। কেউ তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। কাজ দেয় না। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে আবার সে অপরাধ করে। আবার জেলে যায়। আর নিবারণ? কারাভোগীর সংখ্যা তো কেবল বাড়ছেই, তাতে তো প্রমাণিত হচ্ছে না যে দণ্ড পেয়ে কয়েদি ভীত হচ্ছে কিংবা অন্যরা অপরাধ করতে ভয় পাচ্ছে। সমস্যাটা এই যে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় অন্য সবকিছুর মতো আইনের শাসনও যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। বড় অপরাধী ধরা পড়ে না। ধরা পড়লেও ছাড়া পেয়ে যায়। টাকার জোরে। ঘুষ দেয়। নামিদামি উকিল রাখে।
কারা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, কারা কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু কারাগার যেখানে ও যে অবস্থায় থাকার, সেখানেই থাকে। শাস্তি তো দিতেই হবে এবং শাস্তি দিতে হলে জেলে পাঠানো ছাড়া উপায় কী? রাষ্ট্রের জন্য নিশ্চয়ই আরও বড় বড় কাজ রয়ে গেছে। যে রাজনীতিকরা একসময় জেল খেটেছেন, বাইরে এসে তারাও জেলখানার দুরবস্থার বিষয়টা ভুলে যান। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা তাদের জন্য আরও জরুরি কাজ রয়ে গেছে। ক্ষমতা দখল করা, পারলে বিরোধীদের জেলে পাঠানো–এসব সোজা কাজ নয়।
অপরাধীদের বিষয়ে সব সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। টলস্টয় খুবই ব্যথা পেয়েছিলেন লন্ডন শহরে আসামিদের প্রতি পথচারীদের আচরণ দেখে। তিনি দেখলেন, লোকে পারলে মারে, ঢিল ছুড়তে চায়, শাস্তি দিতে আগ্রহী। রুশ দেশে তিনি দেখেছেন ভিন্ন ব্যাপার। সেখানে অপরাধী দেখলে লোকে করুণা করে, বিষণ্ন হয়, ভাবে, ওই বিপথগামীরা শাস্তির নয়, সহানুভূতির পাত্র। এসব পার্থক্য নানা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণেই ঘটে। যেমন আমরা। আমরা অপরাধী দেখলে মারতেও যাই না, চোখের পানিও ফেলি না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা মোটামুটি উদাসীনতার।
কারাসংস্কার জরুরি, আরও জরুরি সমাজসংস্কার। সংস্কারে যে কাজ হবে তাও নয়, প্রয়োজন হচ্ছে সমাজবিপ্লব। অর্থাৎ সেই রকম সমাজ প্রতিষ্ঠার, যেখানে অন্যায় থাকবে না, বৈষম্যের অভাব ঘটবে এবং মানুষ তার মনুষ্যত্বকে বিকশিত করে উচ্চতর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। শত্রুতা থাকবে না, থাকবে মৈত্রী। নির্মূল হবে অপরাধের কারণ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
