ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্মরণ

শহীদ আসাদের রক্তের ঋণ

শহীদ আসাদের রক্তের ঋণ
×

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (১৯৪২-১৯৬৯)

বিমল সরকার

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান পর্বে আইয়ুবশাহির লেলিয়ে দেওয়া পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আসাদ (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান)। দেশব্যাপী ছাত্র ও গণজাগরণ এবং শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর ও শহীদ ড. শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আইয়ুবের পতন হয়। ঐতিহাসিক সেই গণঅভ্যুত্থান ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। 

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বর্ধিষ্ণু ধানুয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪২ সালে আসাদের জন্ম। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত। স্কুলজীবনেই আসাদুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান দুই ভাই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। আসাদের বাবা এমএ তাহের ছিলেন শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ; অসাধারণ মেধাবী এবং অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। আর মা মতিজাহান খাদিজা খাতুন নারায়ণগঞ্জ শহরের খ্যাতনামা আইটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষিকা।

শোষণহীন সমাজ ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আসাদের ধ্যান-জ্ঞান। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল (বর্তমান ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ হল) শাখার সভাপতি; ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা। ছাত্রজীবনেই তিনি নরসিংদীর শিবপুর-হাতিরদিয়া-মনোহরদীসহ আশপাশ এলাকায় কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন। মওলানা ভাসানী ১৯৬৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর গ্রামবাংলায় ‘হাট-হরতাল’ ডেকেছিলেন। ভাসানীর ডাকে আসাদুজ্জামান হাতিরদিয়া বাজারে হাট-হরতাল সফল করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হাতিরদিয়া বাজারে কৃষক সমিতির কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে আইয়ুবের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে পাঁচজন নিহত হন। আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। আসাদদের এলাকায় কৃষকদের এমন হত্যাকাণ্ডে জনতা ফুঁসে ওঠে। ব্যাপক গণজাগরণের সৃষ্টি হয়। শত রকম বাধা আর প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে মওলানা ভাসানী ৯ ডিসেম্বর হাতিরদিয়া এসে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। আসাদ আত্মগোপনে থাকলেও তাঁর পরিবার ও সমর্থকরা এ প্রতিবাদ সমাবেশকে সফল করে তোলেন।

শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন আসাদ। ১৯৬৩ সালে সিলেটের এম সি কলেজ থেকে আইএ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। আসাদ ১৯৬৬ সালে অনার্স ও ১৯৬৭ সালে এমএ পাস করেন। এমএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণি না পাওয়ায় ফল বাতিল করে ১৯৬৮ সালে তিনি পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। একই সঙ্গে এবং একই বিষয়ে (ইতিহাস) সে-বার আসাদের পাশাপাশি বসে এমএ পরীক্ষা দেন তাঁর অনুজ এইচএম মনিরুজ্জামান। আসাদ নিহত হবার এক মাস পর (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯) ফল প্রকাশ হলে দেখা যায় উভয়ে (আসাদুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান) দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করেছেন। আসাদ ছিলেন ঢাকা হলের ৩০২ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র। 

দেশের বেশির ভাগ উপজেলা বা থানা সদরে এমনকি আমাদের স্বাধীনতা লাভের পরও দীর্ঘদিন শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অনগ্রসর বা উপেক্ষিত। নারী-শিক্ষায় ছিল আরও পিছিয়ে। এমনই প্রেক্ষাপটে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে সন্তানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের বীর সেনানী শহীদ আসাদের গর্বিত মাতা-পিতা শিক্ষক দম্পতি এমএ তাহের ও মতিজাহান খাদিজা খাতুন। 

শহীদ আসাদ জীবনের বিনিময়ে আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলেন। বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান রচিত ‘আসাদের শার্ট’– আহা, সে কী কথামালা! আসাদের নামে ঢাকার আসাদ গেটের নামকরণ। ঠিক এমনই আসাদ অ্যাভিনিউ। নরসিংদীর শিবপুরে সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ, শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাই স্কুল, শহীদ আসাদ সরণিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান-স্থাপনা আসাদের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার ২০১৮ সালে আসাদকে স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শহীদ আসাদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা।

বিমল সরকার: অবসরপ্রাপ্ত 
কলেজ শিক্ষক

আরও পড়ুন

×