ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ

একটি গাছ কাটলে দুটি রোপণ করুন

একটি গাছ কাটলে দুটি রোপণ করুন
×

মানুষ বাড়ছে কমছে বৃক্ষ

কামরুজ্জামান

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৫:৩৮

গাছ কাটতে সময় লাগে না। কিন্তু একটা গাছ বড় হতে ন্যূনতম ২০ বছর সময় লাগে। প্রশ্ন হচ্ছে– গাছ যেভাবে কাটা পড়ছে বা কাটা হচ্ছে কিংবা নিধন হচ্ছে– গাছ কি সেভাবে বেড়ে উঠছে? বনভূমি কেন কমছে, কেন নিধন হচ্ছে গাছ– এর কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কারণগুলো আমরা সবাই জানি। তারপরও আলোচনা করা প্রয়োজন।

আমাদের দেশ আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি। এই বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার আবাসন চাহিদা এবং গৃহস্থালি চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য গাছ ও কাঠের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণেই গাছ কাটা হচ্ছে। দখল হচ্ছে বনভূমি। বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এসব জনসংখ্যার আবাসন চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন বাড়িঘর। মানুষ বাড়ছে– জায়গা তো বাড়ছে না। ফলে জমির আইল কমছে, বনজঙ্গল কমছে, কমছে প্রাকৃতিক বনায়ন।
একটা বাড়ি ভেঙে দশটা বাড়ি হচ্ছে। বাড়িঘর বাড়ছে আর প্রভাব পড়ছে গাছপালা ও বনভূমির ওপর। বাড়িঘরও তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিত উপায়ে। অপরিকল্পিত উপায়ে বাড়িঘর তৈরি করতে গিয়েই গাছপালা বেশি কাটা পড়ছে। এটা বেশি হচ্ছে গ্রামগঞ্জে। একটা গাছ বড় হতে ২০-৩০ বছর সময় লেগে যায়। আজ থেকে ৩০ বছর আগে দেশের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ কোটি। ৩০ বছরে গাছপালা ক্রমেই কমছে কিন্তু বাড়ছে মানুষ। এর প্রভাব পড়ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর।

আমাদের দেশের মানুষ নানা কারণে গাছ কাটে। অজ্ঞতা এবং খামখেয়ালির মতো কারণও রয়েছে। এমনও দেখা যায়, বাড়িঘর তৈরি করার সময় কিংবা বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার সময় অথবা বিদ্যুতের লাইন টানার সময় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি গাছ কেটে ফেলে। অথচ ইচ্ছা করলেই কিছু গাছ বাঁচানো সম্ভব। বিদ্যুতের সংযোগ ও লাইন ঠিক রাখার জন্য গাছের ডাল ও লতাপাতা কাটার কারণেও অনেক সময় গাছ মরে যায়। আমার দেখা বিভিন্ন রকমের প্রকল্প যেমন– রাস্তা, ব্রিজ কালভার্ট, ভবন নির্মাণ ইত্যাদি কারণেও গাছ কেটে ফেলা হয়। বিভিন্ন সময় এসব নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশকর্মীদের আন্দোলন করতেও দেখা যায়। তারপরও বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। গাছ কাটা পড়ছে।

বাংলাদেশের অনেক জায়গায় বনভূমি দখল হচ্ছে। বিশেষ করে শিল্প কারখানা, হোটেল রিসোর্ট ইত্যাদি তৈরি করার নামে বনভূমির জায়গা দখল করছে। কমছে গাছ। আমাদের গাজীপুর জেলার ভাওয়ালগড়ের বনভূমি দিন দিন কমছে। নব্বইয়ের দশকে যে গাজীপুর ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত ছিল, সে গাজীপুর এখন শিল্পনগরী। গাজীপুরে বর্তমানে পোশাকশিল্প কারখানাসহ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় তিন হাজারের মতো। গাজীপুর জেলার বর্তমান লোকসংখ্যা (আদমশুমারি ২০২২) প্রায় ৫২ লাখ ৬৩ হাজার ৪৫০ জন। ভাসমান লোকসংখ্যা হবে আরও ১০ লাখ। এসব লোকের আবাসন চাহিদার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে বাড়িঘর। প্রকারান্তরে কমছে বৃক্ষ। শিল্প কারখানাগুলো প্রথমে অল্প কিছু জায়গা কিনে নির্মাণ কাজ শুরু করে। এরপর আস্তে আস্তে শুরু করে জবরদখল। খালপাড়ের জমি, প্রাকৃতিক জলাশয়ের জমি, কৃষিজমি ও বনভূমি– সবই দখল করে নেয়। এভাবেই কমছে বনভূমি।

দেশে নগরায়ণ আশীর্বাদ না গলার কাঁটা এখনই বলা যাবে না। ঢাকা বায়ু দূষণের নগরী। ঢাকা পরিবেশ দূষণের নগরী। বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে আরও আগেই মর্যাদা হারিয়েছে। রাজধানী ঢাকায় গাছপালা নেই বললেই চলে। ওসমানী উদ্যান, রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন– এসব জায়গায় অল্প পরিমাণে বৃক্ষ অবশিষ্ট থাকলেও উন্নয়নের নামে প্রায়ই গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা শহরে দুই কোটির ওপরে মানুষের বসবাস। অথচ প্রায় বৃক্ষশূন্য একটি শহর। এখন অনেকেই ছাদবাগান করছে। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এই ছাদ বাগান মোটেও যথেষ্ট নয়।

মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে কিন্তু পরিবেশ উন্নত হয়নি। বাড়েনি মানুষের সচেতনতা। নগরায়ণের প্রভাবে পরিবেশ দূষণ একটি কমন সমস্যা। এটা হচ্ছে - পৌর বর্জ্য, আবাসিক বর্জ্য , ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিপনি-বিতানের বর্জ্য, হাট-বাজারের বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে। আমাদের দেশে শিল্প কারখানার তরল ও কঠিন বর্জ্য এবং মানুষের ব্যবহৃত নানান রকমের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়। এর ফলে স্থলভূমি, জলাভূমি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এর প্রভাব পড়ছে বৃক্ষের ওপর। এখনকার সময়ে একটা কমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। দৃশ্যটি হলো - রাস্তার পাশে, বনভূমির কোনো কোনো জায়গায় মরা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায় - বায়ু দূষণ ও মাটি দূষণের কারণেই না-কি এমনটি হচ্ছে।

আমাদের দেশে প্রতি বছরই বৃক্ষ রোপণ হয় কিন্তু বৃক্ষ বেড়ে ওঠছে না। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কয়েকটি কারণ হলো- বর্ষায় অনেকেই বৃক্ষ রোপণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখানোর জন্য, সস্তা বাহবা নেওয়ার জন্য। প্রকৃত অর্থে যারা পরিবেশের কল্যাণে বৃক্ষ রোপণ করে তাদেরও রয়েছে নানাবিধ অসঙ্গতি ও স্বল্পতা। বৃক্ষ রোপণ করলে অবশ্যই চারাগাছে বাঁশ দিয়ে বেড়া দেওয়া উচিত। প্রায়শই দেখা যায় বৃক্ষ রোপণ করে কিন্তু বেড়া দেয়া না বা বেড়া দেওয়ার অর্থ সংকটে ভোগে। বৃক্ষ রোপণ করার পর পরিচর্যার একটা ব্যাপার আছে যেটা আমাদের দেশে হয় না বললেই চলে। ফলে বৃক্ষ রোপণ সফল হয় না।

সরকারি বেসরকারি ব্যক্তিগত যে যেভাবেই বৃক্ষ রোপণ করুক না কেন চারাগাছ রোপণ করার সাথে সাথে বেড়া দেওয়া উচিত। গাছ বড় হওয়ার জন্য পরিচর্যা করা উচিত। তাহলেই রোপন কৃত গাছটি নিরাপদে বেড়ে উঠা সম্ভব।

মানুষ বাড়ছে কমছে বৃক্ষ। প্রকৃতির জন্য এটি ভালো দিক নয়। একটি গাছ কাটালে অন্তত দু'টি গাছ রোপণ করা উচিত। এটা স্লোগান হওয়া প্রয়োজন। মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর সযত্নে বেড়ে ওঠে। নিরাপদে বৃক্ষের বেড়ে ওঠার জন্য যত্নের প্রয়োজন, সুরক্ষা প্রয়োজন।


ড. কামরুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ , গাজীপুর
 

আরও পড়ুন

×