তৃতীয় মেরু
ইশতেহারে নদী: নিয়ত ভালো, তরিকায় ভ্রান্তি
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০০ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বুধবার জামায়াতে ইসলামী এবং শুক্রবার বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বলা বাহুল্য, নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধের খড়্গে পড়ে দেশের অপর প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবার মাঠের বাইরে।
ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত বেশি ‘প্রস্তুত’ বলে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা হলেও অন্তত ইশতেহারের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রথমটিই এগিয়ে। বাকিগুলোর কথা বাহ্য; পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এবার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার নিজেদের তো বটেই, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অতীতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। ইশতেহার প্রণয়নে পরিবেশ সম্পর্কে জানাবোঝা তরুণ একটি টিমকে সম্পৃক্ত করার সুফল দলটি সম্ভবত পেয়েছে। আমাদের বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এম. এ. বাতেন এ প্রসঙ্গে ফেসবুকে যথার্থই লিখেছেন– ‘আমি পরিবেশের লোক। সেই হিসাবে উইথ কনভিকশন বলতে পারি, পরিবেশ নিয়ে এত ডিটেইল ও আপডেটেড পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে দেয়নি।’
অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বা কর্মসূচিতে পরিবেশ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ও তৎপরতা কেবল বাংলাদেশেই বাড়েনি; জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যত স্পষ্ট হচ্ছে, আর্থসামাজিক কারণেও বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে ততই পরিবেশ বিষয়ে মনোযোগী হতে হচ্ছে।
মনে আছে, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করায় তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নদী ও পানিসম্পদ বিষয়ক প্রতিশ্রুতি বিশ্লেষণ করেছিলাম। সেখানেও স্পষ্ট হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে ক্রমেই পরিবেশ বিষয়কে নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করেছে। অনেকের মনে থাকার কথা, ২০১৭ সালেই বিএনপি যে ‘ভিশন ৩০৩০’ প্রকাশ করেছিল, সেখানে ‘পানিসম্পদ, নীল অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ’ শিরোনামে আলাদা বিভাগ রেখেছিল। মবপন্থিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্যের স্বার্থে এটাও বলতে হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগও পরিবেশ ও পানিসম্পদ ইস্যুতে সংবিধানে ১৮/ক অনুচ্ছেদ সংযুক্তিসহ রাজনৈতিক দল হিসেবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশকিছু যুগান্তকারী নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। বাস্তবায়নের মান ও পদ্ধতি কেমন ছিল, সেটা ভিন্ন আলোচনা।
যা হোক, এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি ও জামায়াতের নদী বিষয়ক প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্লেষণ ও তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির ভাষ্য একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট ও সামগ্রিক। অন্যদিকে জামায়াতের ভাষ্যগুলো ভাসা ভাসা ও আংশিক। বিএনপি যেখানে বিস্তারিত, জামায়াত সেখানে মোটাদাগ মাত্র। জামায়াত যেখানে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, বিএনপি সেখানে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছে।
যেমন জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক নদীতে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক, আইনগত এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাভিত্তিক সকল প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ অপরদিকে, বিএনপির ইশতেহারে এই বিষয়েই অন্তত তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলেছে।
প্রথমত বলেছে, ‘যৌথ নদী কমিশনকে শক্তিশালী করে সীমান্তের ওপার থেকে প্রবাহিত নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই ব্যাপারে নেপাল, ভুটান ও চীনকেও অংশীদার করা হবে। এ ছাড়াও সব পানি চুক্তি নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হবে যাতে কোনো দেশই একতরফা সুবিধা না পায়।’
দ্বিতীয়ত বলেছে, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে পানি নিরাপত্তা, বন্যা ও মরূকরণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা হবে। এই উদ্যোগে ৭৫ লাখ হেক্টর জমি সেচ সুবিধা পাবে এবং ৫ কোটিরও বেশি মানুষ বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে।’
তৃতীয়ত বলেছে, ‘জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশন-১৯৯৭ (কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য নন- নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকোর্সেস) স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পানির সমস্যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরা হবে।’

আবার, বিএনপির ইশতেহারে নদী ও পানিসম্পদ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে বলেই যে সেটা শতভাগ ‘সঠিক’; তেমন নয়। যেমন, দলটির ইশতেহারে যদিও জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ‘স্বাক্ষর’ করার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে বাংলাদেশে এটা ১৯৯৭ সালেই স্বাক্ষর করেছিল। বাকি থেকে গিয়েছিল অনুস্বাক্ষর বা অনুসমর্থন তথা সংসদে বা মন্ত্রিসভায় ‘রেটিফাই’ করা। বস্তুত, গত দুই দশক ধরে আমরা বারংবার বলে আসছি, আন্তঃসীমান্ত নদীবিষয়ক রক্ষাকবচগুলো স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর করা উচিত বাংলাদেশের। যেমন, কয়েক বছর আগেই লিখেছিলাম, ‘হেলায় ফেলে রাখা আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ’ (সমকাল, ১৩ অক্টোবর ২০২১)।
দেশের নদী অধিকার আন্দোলনের জগতে এটা বহুল আলোচিত বিষয় যে, বিএনপির তৃতীয় শাসনামলে (২০০১-২০০৬) তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ অনুসমর্থনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ সভার আয়োজন করেছিলেন। সভায় অংশগ্রহণকারী ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জনই মত দিয়েছিলেন, দলিলটি অবিলম্বে অনুসমর্থন করা উচিত। কিন্তু ওই প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। বিস্তারিত পড়ুন ‘জাতিসংঘ পানি সনদ: নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারিক প্রশ্ন’ (সমকাল, ৪ মে ২০২৫)।
যেমন, বিএনপির ইশতেহারে যে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন ‘সামান্য’ নাম নিয়ে। সপ্তাহ দুয়েক আগেই এক নিবন্ধে লিখেছিলাম, “প্রস্তাবিত ব্যারাজ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়িত প্রকল্পে ‘গঙ্গা’ নদীর নাম জোর করে ‘পদ্মা’ রেখে কী লাভ হবে জানি না। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে উজানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবাহিত নদীতে বাংলাদেশের যে অববাহিকাভিত্তিক অধিকার, সেটাকে যেচে খর্ব করা হচ্ছে।” বিস্তারিত পড়ুন ‘গঙ্গা ব্যারাজের ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি’ (সমকাল, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬)।
যেমন, বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘বন্যাকবলিত এলাকাতে উঁচু রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, কালভার্ট এবং আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ এটা মোটাদাগে ভালো নিয়ত। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে দেখলে বোঝা যাবে, প্রকৃতির আশীর্বাদ বন্যা যেসব মনুষ্যসৃষ্ট কারণে অভিশাপ হয়ে ওঠে, এর অন্যতম প্রধান কারণ ‘উঁচু সড়ক’। এসব সড়কে বাধাগ্রস্ত হয়েই বন্যার পানি বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। উর্বরতা আনা বন্যায় তখন বরং ফসলের জমি উর্বরতা হারায়। গত পাঁচ দশকে দেশের বিভিন্ন জনপদ ও জলপ্রবাহে ‘কালভার্ট’ বসিয়ে নদী ও নৌ চলাচল ব্যবস্থার কী ক্ষতি হয়েছে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত না গিয়ে এককথায় বলা যায়, কালভার্ট আর চাই না!
অবশ্য, জামায়াতের ইশতেহারে বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলায় যেভাবে ‘ডাচ ডেল্টা মডেল’ বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে, সেটা আরও বিপজ্জনক। বস্তুত গত ছয় দশকে পাথুরে ডাচ ডেল্টার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকৌশল পলল বঙ্গীয় ডেল্টায় অনুকরণ করতে গিয়েই যত সর্বনাশের শুরু! অথচ আমাদের দেশে তারও আগের হাজার বছর ধরে নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় লোকায়ত প্রজ্ঞা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তখন নদী ও জলাভূমিগুলোর স্বাস্থ্য এখনকার চেয়ে ভালো বৈ মন্দ ছিল না।
বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব। কিন্তু স্থানাভাবে দুই-চারটি উদাহরণ দেওয়ার পর এককথায় বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ব্যাপারে দল দুটির নিয়ত ভালো হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে ভ্রান্তি স্পষ্ট। নির্বাচনের পর যারাই ক্ষমতায় যাক, এসব ব্যাপারে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় চিন্তা করবে, আশা করা যায়। দুখি মানুষের এই দেশে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের প্রকল্প ও প্রকৌশল সিন্ডিকেট এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ও সাশ্রয়ী সদ্ব্যবহারের বিকল্প নেই।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
