ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আলজাজিরা

নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের নেপথ্যে

নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের নেপথ্যে
×

আবু জাকির

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কোনো বৈপ্লবিক কিছু ছিল না। বরং এ ছিল পুরোনো হিসাবনিকাশের ব্যাপার। ভোট গণনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিজয় লাভ করেছে দলটি।  

বিএনপি কেন জয়লাভ করল, তা বুঝতে হলে প্রথমেই এই নীরস বক্তব্য বাদ দিতে হবে– এই সময়টা জামায়াতের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জেআই) ৬৮টি আসন পেয়েছে, যেখানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি। ১৯৯১ সালে সর্বোৎকৃষ্ট সংসদীয়  নির্বাচনে মাত্র ১৮টি আসন পাওয়া একটি দলের জন্য এটি কোনো ছোট কৃতিত্ব নয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ফলাফল সেই দাবিকে সমর্থন করছে। কিন্তু এফপিটিপি পদ্ধতিতে ভোটের হার বৃদ্ধি পেলে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না। 

এই নির্বাচন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব দ্বারা পরিচালিত হয়নি, যদিও এটি ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার স্বৈরাচারকে উৎখাত করে গণঅভ্যুত্থানের ফলে ঘটেছিল। কিন্তু এরই মধ্য দিয়ে ভেতরগত আদর্শিক কোনো ভাঙন ঘটেনি এবং ভোটারদের আনুগত্যের কোনো স্থায়ী পুনর্বিন্যাসও ছিল না; অন্তত এমন মাত্রায় নয় যা দেশের নির্বাচনী ধ্যান-ধারণার কাঠামো ভেঙে দেবে। তা ছাড়া এটি অবশ্যই কোনো এক দিকে ঝুঁকে পড়া জাতীয় নির্বাচনও ছিল না, যেখানে শ্রেণি, লিঙ্গ ও অঞ্চল নির্বিশেষে একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঢলে পড়ে। আমরা দেখেছি একটি হাইব্রিড নির্বাচনী ফলাফল, যেখানে কিছু বিচ্যুতি থাকলেও তা ছিল পূর্বাভাসযোগ্য। 

দলের অনুগতদের বেশির ভাগই ছিল নিজেদের। সুইং ভোটারদের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি হতাশা সাময়িকভাবে দলত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যাদের অনেকেই জামায়াত বা এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন। ক্ষোভই ছিল আসল। ৫ আগস্টের পর জেলাজুড়ে ক্ষুদ্র নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। গ্রামীণ বাজার ও শহুরে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দলত্যাগই কেবল দলটির জন্য ভাগ্য ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের চেয়ে বিএনপির ভিত্তি শক্তিশালী এবং সাংগঠনিকভাবে গভীরে প্রোথিত, যা ভেঙে পড়েনি। দলত্যাগের ঘটনা ঘটলেও সংখ্যার দিক থেকে এটি ছিল বেশ বড়। বিএনপির মনোনয়ন কৌশল অপ্রত্যাশিত হলেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। যেখানে জামায়াত তুলনামূলক অপরিচিত কিন্তু আদর্শিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বদের প্রার্থী করেছিল, সেখানে বিএনপি তার পুরোনো রক্ষীদের ওপর নির্ভর করে, যাদের রয়েছে প্রতিষ্ঠিত নাম ও যশ এবং শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক। 

বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশে এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শহুরে, শিক্ষিত ভোটাররা নীতিগত শাসনব্যবস্থার বাগাড়ম্বর শুনে রোমাঞ্চিত হতে পারে। তাদের কাছে একজন নীতিবান, আদর্শিকভাবে সুশৃঙ্খল প্রার্থীর ধারণা নৈতিক পুনর্গঠন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু গ্রামীণ ভোটাররা বাস্তববাদী। তারা জটিল পরস্পরকে সমর্থন ও আনুগত্যের জটিল সম্পর্কের মধ্যে কাজ করে। একজন এমপি কোনো বিমূর্ত কিংবা বায়বীয় কোনো কিছু নয়; তিনি নিরাপত্তা, চাকরি, স্থিতিশীলতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিকারী হিসেবে ভূমিকা রাখেন। বিচ্ছিন্নভাবে সততা সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা দেয় না। পরিচিতি এই সুবিধাটা নিশ্চিত করে।
এভাবেই মূল ভোটারদের মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি হয়। বিএনপির বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হয়ে অনেকেই পরিবর্তনের কথা ভেবেছিলেন। যেসব আসনে জামায়াত একজন সুপরিচিত নেতাকে প্রার্থী করেছিল, সেখানে কেউ কেউ সফলও হয়েছেন। কিন্তু অন্যত্র ভোটাররা এমন প্রার্থীদের মুখোমুখি হয়েছিল, যাদের তারা চেনে না, যাদের ‘সততা’যাচাই করতে পারেনি এবং যাদের দল নৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের বাইরে খুব বেশি কিছু দেয়নি। অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে তারা সেই ‘খারাপ’ মানুষকে বেছে নেয়, যেভাবে তারা তাকে জানে। একদিকে জামায়াতের কৌশলগত ভুল ছিল, অন্যদিকে দলটি তার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো আরও বাড়িয়ে তোলে। নারী ইস্যুতে তাদের অবস্থান নারী ভোটারদের একটি বৃহৎ অংশকে কাছে টানতে ব্যর্থ হয়।

আবু জাকির: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×