ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নগর জীবন

ঢাকা শহর নিয়ে নতুন প্রত্যাশা

ঢাকা শহর নিয়ে নতুন প্রত্যাশা
×

অমিতোষ পাল

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা দীর্ঘদিন পর আবার একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছি। ফলে সরকারের কাছে সারাদেশের মানুষের মতো ঢাকাবাসীরও প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশার কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে যানজটের কথা। যানজটে আটকে প্রতিদিন ঢাকাবাসীর প্রায় ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, টাকার অঙ্কে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও ঢাকায় পা ফেললে এই ভোগান্তিতে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে শারীরিক, মানসিকসহ নানাভাবে। গত দেড় বছরে এ ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে ‘ব্যাটারি রিকশা’ নামে এক যান। এমন কোনো সড়ক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে তা চলে না। এটিকে অবশ্যই একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে। যত দ্রুত এটি করা সম্ভব সরকার ও রাজধানীবাসীর জন্য ততই মঙ্গল। 

রাজধানীবাসীর আরেকটি বড় সমস্যা ফুটপাত। হাঁটার মতো ফুটপাত থাকলে এক কিলোমিটার হেঁটে বাসে বা ট্রেনে উঠে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রিকশারও প্রয়োজন হয় না। এতে শারীরিক সুস্থতাও অনেকটা নিশ্চিত হয়। কিন্তু ঢাকা শহরে মানুষ নিরাপদে হাঁটবে সে অবস্থা নেই। এমনিতেই ফুটপাত অপর্যাপ্ত। এর বেশির ভাগ আবার ব্যবহারযোগ্য না। হয় ভাঙাচোরা, না হলে হকার ও অবৈধ দোকানপাটে ভরা। এমনকি ফুটপাতের পর সড়কও দখল করে নিয়েছে অনেক হকার। বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশন লোক দেখানো ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও এর সুফল আসেনি। গবেষণা বলছে, বছরে ঢাকা শহরে ফুটপাত থেকে চাঁদা ওঠে এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এর সুবিধাভোগীদের মধ্যে রাজনৈতিক আশীর্বাদধন্যরা আছেন, আছে পুলিশও। তাই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হলে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে সবকিছুর আগে। 

স্বাধীনতার ৫৫ বছর হতে চললেও ঢাকা শহরে আধুনিক, নারী-শিশু ও বয়স্কবান্ধব একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। রাজধানী শহরে ট্যাক্সি নেই–এমন শহর আমি এখনও দেখিনি। ঢাকা শহরই মনে হয় এর ব্যতিক্রম। এখানে ট্যাক্সি বলতে নগরবাসী মনে করেন উবার-পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ার ব্যবস্থা। পরিবহন মালিক-চালকদের স্বেচ্ছাচারিতাকেই সব সময় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বর্তমান সরকারও কি তাদের কাছে নতি স্বীকার করবে কিনা, তা এখন দেখার বিষয়। কিন্তু যে সরকার একটি ব্রুট মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে, তারা চাইলে গোষ্ঠীস্বার্থ না দেখে জনস্বার্থকেই প্রাধান্য দিতে পারে। 

বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষ পর্যায়ে ঢাকা শহর প্রায় প্রতিদিনই থাকে। দুই দশক ধরে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ দূষণ কী কারণে হয় তা আমরা সবাই জানি। রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির উপযুক্ত সমন্বয়, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করলে এ ক্ষেত্রে একটা সফলতা পাওয়া যাবে। কিন্তু অতীতে সব সময় দেখেছি যানবাহনগুলোতে কালো ধোঁয়ার বাহার। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারে পরিবেশ নিয়ে সোচ্চার থাকা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ছিলেন পরিবেশ উপদেষ্টা। তিনিও এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। অথচ পরিবেশ দূষণের কারণে ঢাকাবাসী নীরবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই দূষণের কারণেই নারীর প্রজনন ক্ষমতা ভয়াবহ মাত্রায় কমে যাচ্ছে। 

সুস্থ বিনোদন ঢাকা শহরে যে কতটা প্রকট তা বলে শেষ করা যাবে না। শিশু-কিশোর-যুবসমাজের একসময় প্রধান বিনোদন ছিল খেলাধুলা। ঢাকা শহরে খেলার মাঠ না থাকায় এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে কোনো অভিভাবক এখন এ আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন তার বাচ্চা বিকেল হলে খেলার মাঠে যাবে। ফুটবল, দাড়িয়াবান্ধা, ক্রিকেট বা হাডুডুর মতো খেলা খেলবে। বিভিন্ন সময় যারা মেয়র হয়েছেন তারা ওয়াদা দিয়েছেন প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ করার। কেউ করতে পারেননি। সর্বশেষ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান করেছে, সেখানেও মাঠের কথা জোরালোভাবে এসেছে। গত তিন বছরে তার কোনো ছিটেফোঁটাও বাস্তবায়িত হয়নি। ভবিষ্যতে কবে হবে তারও ঠিক নেই। বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে অন্তত প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। এটি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এক ধরনের অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি হলে কিছু করার থাকবে না। 

জলাবদ্ধতা রাজধানীর আরেক সমস্যা। প্রতি বর্ষা মৌসুমে এ জন্য ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। এ সমস্যা নিরসনে বছরের পর বছর কেবল খাল উদ্ধার ও জলাশয় রক্ষার কথা বলা হচ্ছে। খালও উদ্ধার হচ্ছে না, জলাধারও ভরাট হচ্ছে। খাল রক্ষার নামে কত টাকা যে এই খালে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। একসময় খাল নিয়ে টানাটানি ছিল ওয়াসা আর সিটি করপোরেশনের মধ্যে। গত সরকারের আমলে সেটির সমাধান হলেও আসলে কাজের কাজ কিছু হয়নি। খালগুলো এখন মশার বংশবিস্তারের সবচেয়ে বড় উৎস্থল। অথচ খালগুলোতে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে আর ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখলে মশার বাড়বাড়ন্ত হতো না। জলাবদ্ধতা থেকেও নগরবাসী মুক্তি পেত।

রাজধানীর অনেক অলিগলি রয়েছে, যেখানে পাশাপাশি দুজনের হেঁটে চলাই মুশকিল। এগুলো কীভাবে প্রশস্ত করা যায়, তা নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। পরিকল্পনা ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাজধানীতে আর একটি ইটও যেন গাঁথা না হয়। 
গত দেড় বছরে বড় আলোচনার বিষয় ছিল নিরাপত্তা। নগরবাসীর নিরাপত্তা কীভাবে দেওয়া যায়, সরকারকেই তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বে অনেক শহর আছে সারারাতই জেগে থাকে। সেখানে নারীর নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হয় না। বাংলাদেশ কেন পারবে না একজন নাগরিককে রাতে নিরাপত্তা দিতে?

অমিতোষ পাল: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×