রাজনীতি
গণভোট বাস্তবায়ন বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘কমন সেট’ তত্ত্ব
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৬ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৫
শত অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তাবোধ উতরিয়ে অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ (৬০ শতাংশ) জনগণের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রতি বিশেষ আগ্রহই প্রকাশ করে। কিন্তু এর মধ্যে বাদ সেধেছে গণভোটের রায় এবং এর বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা। গণভোটের সাংবিধানিক বৈধতা কিংবা পিপলস উইল বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হওয়া বাগ্যুদ্ধ অব্যাহত। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য দরকার এর শান্তিপূর্ণ সমাধান।
গণভোট বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয় এবং নয় একক কোনো সমাধান। বিশেষ করে সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় যেখানে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে আরও নয়। এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় গণভোটকে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতাই বেশি পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ গণভোট কোনো অবস্থাতেই প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের গণসার্বভৌমত্বের এবং ন্যায়সংগত সমাধান অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব বহন করে না। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার (মেজরিটারিয়ান টাইরেনি) ঠেকাতে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ভারতের উচ্চ আদালত এক রায়ের মাধ্যমে দেশটির সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় গণভোটকে নিরুৎসাহিত করেছে।
বাংলাদেশে একদিকে কেউ কেউ সংবিধানের ৭ ধারা অনুযায়ী এই গণভোটকে অবৈধ বলার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, যেহেতু জনগণের পরোক্ষ ‘ম্যান্ডেট’ নিয়ে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তাই তারা ‘যা খুশি তাই’ করতে পারবে! সংবিধানের ৭ ধারা অনুযায়ী, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারই ক্ষমতার উৎস। বিদ্যমান সংবিধানে ‘রেফারেন্ডাম’-এর কথা কোনো ধারায় সরাসরি বলা নেই। তবে গণভোট আইন ১৯৯১ এবং সংবিধানের ১৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে কোনো বিল বা প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির মতামতের ভিত্তিতে তা কেবল গণভোটের জন্য আইনি ভিত্তি পায়।
এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে: বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কি বিপ্লবী সরকার ছিল? সরকার কি গত দেড় বছর সংবিধান স্থগিত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হবে– ‘না’। উত্তর ‘হ্যাঁ’ দিতে চাইলে ‘যদি-কিন্তু’ যোগ করতে হচ্ছে। অধিকন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এখনও সংসদের ক্ষমতা আছে রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ করার। তাই বিদ্যমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির আদেশকে ‘অহি’ বাণী হিসেবে চিন্তা করা কতটা সমীচীন?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল বিএনপি কি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে? নাকি অন্য যেসব রাজনৈতিক দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব আছে (কিংবা নেই) তারাও দিয়েছে? উত্তর– হ্যাঁ। জামায়াতে ইসলামীও দুটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে এবং যে দলটি ভোটের শতাংশে তৃতীয় অবস্থানে আছে (এনসিপি), সেই দলও একটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। কেন বিএনপি যে বিষয়ের ওপর নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে?
জুলাই জাতীয় সনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নোট অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’ অর্থাৎ যে দল ক্ষমতায় যাবে, সে দল বা জোট তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অনুযায়ী বাস্তবায়নযোগ্য সব ধারা বাস্তবায়ন করবে, যা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সুপ্রিমেসিকেই গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে নোট অব ডিসেন্টের অধিকার খোদ জুলাই সনদই দিয়েছে।

সনদে সর্বমোট ৮৪টি পয়েন্ট বা ধারা রয়েছে, যেখানে ছোট-বড় ৩০টি রাজনৈতিক দল মতামত দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি ধারার ওপরেই কোনো না কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে এবং প্রতিটি ধারার নিচে এই নোট অর্থাৎ পাদটীকা দেওয়া আছে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ১ ও ১৩ নম্বর ধারার মতো দুই-একটি বিষয় এর ব্যতিক্রম, যেগুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নেই সেগুলোতে এই পাদটীকা বা নোটও সংযুক্ত করা হয়নি।
এই বিরোধ নিরসনে পরিসংখ্যানের ‘কমন সেট’ তত্ত্ব একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, যার মূল লক্ষ্য হলো বিভেদ কমিয়ে ঐকমত্যের একটি ভিত্তি তৈরি করা। বিএনপি যে ধারাগুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলোর বাইরের বাকি বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ জুলাই সনদের আলোকে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ও ছাড়ের মানসিকতা না রাখলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল বিএনপি নয়, বরং সংসদের অন্য দলগুলোর দেওয়া দ্বিমতগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি হবে উক্ত বিএনপিসহ সব প্রতিনিধিত্বকারী দলের প্রস্তাবগুলোকে একেকটি আলাদা বৃত্তে প্রতিস্থাপন করলে বৃত্তগুলোর ইন্টারসেক্টেড বা সম্মিলিত সাধারণ অংশটিই হবে একটি ‘কমন সেট’। এই সম্মিলিত অংশটুকুই হবে জনসার্বভৌমত্বের সত্যিকারের প্রতিফলন। অর্থাৎ ভোটাররা একই সঙ্গে দলগুলোর প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে সংসদে প্রেরণ করেছে এবং হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টসহ সব অবস্থানের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
বিএনপি সরকার কেবল এই সর্বজনস্বীকৃত ধারাগুলোই বাস্তবায়ন করবে এবং সব দল এবং জোটের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংবলিত বিষয়গুলো সংসদে বিতর্কের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করতে পারে। গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্থায়ী করতে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হয়। উভয় পক্ষ নিজ অবস্থানে অনড় থাকলে সমাধান হতে হবে ‘কোয়ারসিভ’ বা বলপ্রয়োগমূলক, যা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন ‘প্যাসিফিক মেজারস’ বা শান্তিপূর্ণ উপায়। দুপক্ষকেই ছাড় দিয়ে সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে এই ‘কমন গ্রাউন্ড’-এ আসতে পারে।
সংবিধানের ৭ ধারা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন স্বীকৃত হলেও ‘উইনার টেকস অল’– গণতন্ত্রের এই সংকীর্ণ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলেও বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, বড় একটি জনগোষ্ঠী (৪০ শতাংশ) ভোটাধিকার প্রয়োগ করেনি, যা এই ফলাফলের সমীকরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারত। অন্যদিকে বিরোধীদের বুঝতে হবে, আজ তাদের দাবি মেনে নিয়ে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কালই তা বাতিল করে দিতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কেবল ‘ব্যয় সংকোচন’-এর অজুহাতে উচ্চকক্ষের মত অন্যান্য সংস্কার বিলুপ্ত করে দিতে পারে। ফলে সংবিধানের যে কোনো মৌলিক সংশোধনের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সমঝোতাই সঠিক পথ।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- রাজনীতি
- গণভোট
- সাজ্জাদ সিদ্দিকী
