ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিস্বর

জননিরাপত্তা বলতে আমরা যা বুঝি

জননিরাপত্তা বলতে আমরা যা বুঝি
×

ইকরাম কবীর

ইকরাম কবীর

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অনেক আগেই আমাদের নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়েছিল। এই চিন্তাই সবচেয়ে প্রাচীন। অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রের চেয়েও বেশি আমরা যা চাই তা হচ্ছে নিরাপত্তা। হাজার হাজার বছর পরও সেই চাহিদা আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। সহিংসতা, হানাহানি, চুরি, ডাকাতি, হয়রানি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক উশৃঙ্খলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এখনও চলছে। আমরা চাই এসব অপরাধ না থাকুক। তবে মানুষের নিরাপত্তাবোধ শুধু অপরাধ না থাকায় নির্ভর করে না; স্থিতিশীলতা ও আস্থাও চাই। 

আস্থা হচ্ছে সেই অনুভূতি, যখন মনে করব আমাদের জীবনযাপনের পথচলা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে না। যখন আমরা মৃত্যুচিন্তা ছাড়াই সড়কে চলাচল করতে পারব; ভ্রমণে বেরুতে পারব। সন্তানদের বড় করতে পারব; ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে পারব; কথা বলতে ও ঘুমাতে যেতে পারব কোনো ভয় ছাড়াই। সেটাই নিরাপত্তা।

জননিরাপত্তা ধারণা আমাদের চোখে সহজ– সমাজে সবার সামগ্রিক সুরক্ষা। অপরাধ থেকে সুরক্ষা, দুর্ঘটনা ও দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা, প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ থেকে সুরক্ষা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা এবং সংকটকালে অবহেলা থেকে সুরক্ষা। আমরা বৃহত্তর সামাজিক নিরাপত্তা বলতে বুঝি খাদ্য, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, ন্যায়বিচারের মতো জরুরি সেবা প্রয়োজনের সময় ভেঙে পড়বে না।

জননিরাপত্তার কয়েকটি স্তম্ভ আছে– প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস, সমাজে স্থিতিশীলতা, দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার ব্যবহারে ন্যায্যতা। আমরা নিরাপদ বোধ করি যখন দেখি পুলিশ, আদালত, স্বাস্থ্যসেবা, দমকল, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতারা জনস্বার্থে কাজ করছেন। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো সাড়া দেয় এবং দুর্নীতি ও পক্ষপাত ছাড়াই কাজ করে, তখন আমরা আস্থা শ্রেণি, জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, ন্যায় নিশ্চিত হলে আমরা সেই সমাজকে নিরাপদ মনে করি।
তো, এই নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?

মূল দায়িত্ব অবশ্যই রাষ্ট্রের। কারণ শুধু রাষ্ট্রেরই আছে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়নের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা ও সেবা দেওয়ার সামর্থ্য। রাষ্ট্রই পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, দমকল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবহন নিয়ন্ত্রক এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। রাষ্ট্রই হুমকি ও সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রকে সামাজিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার অভাব থাকলে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন নিরাপদ বোধ করতে পারে না। হতাশা বাড়লে অপরাধ বাড়ে। বৈষম্য বাড়লে সহিংসতা বাড়ে। যেখানে প্রতিষ্ঠান নেই বা দমনমূলক, সেখানে অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।

তবে রাষ্ট্র একা সবকিছু করতে পারে না। নিরাপত্তা একটা যৌথ দায়িত্ব এবং সেখানে নাগরিকের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের আইন মানতে হবে, জনসম্পদ রক্ষা করতে হবে, হুমকিমূলক বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধ করতে হবে।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা শুরু হয় সচেতনতা থেকে। দরজা বন্ধ রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা, জরুরি নম্বর হাতের কাছে রাখা, প্রযুক্তি সচেতনভাবে ব্যবহার করা, দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানো, শিশুদের নিরাপত্তা শেখানো এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা– এগুলো সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপদ পাড়া গড়ে ওঠে সহযোগিতা, বিশ্বাস ও যৌথ সতর্কতার ওপর। এক পাড়ায় একে অন্যকে চিনলে-জানলে, অপরাধীদের তৎপরতা কমে যায়। 

আধুনিক জননিরাপত্তা শুধু ঘরের বাইরের বিষয় নয়; হাতের মুঠোয় থাকা ‘ডিজিটাল’ নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত রাখা, তথ্য যাচাই করা, প্রতারণা এড়ানো এবং সাইবার হুমকি মোকাবিলার উপায় জানা এখন জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক তথ্য এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি। 
তবে নিরাপত্তা শুধু সুন্দর আচরণের ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হয়, যেখানে নিজেকে রক্ষার দুশ্চিন্তায় থাকতে না হয়। নিরাপদ সমাজে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভয় দেখিয়ে নয়, সেবা দেওয়ার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে। 

আলোকিত রাস্তা, নিরাপদ গণপরিবহন, পথচারীবান্ধব এলাকা, সুরক্ষিত পার্ক, সহজলভ্য জরুরি সেবা এবং নিয়ন্ত্রিত নির্মাণ ব্যবস্থা। অনেক দুর্ঘটনা, অপরাধ ও দুর্যোগের কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সঠিক ড্রেনেজ জলাবদ্ধতা কমায়; ভবন নির্মাণে সততা সুরক্ষা দেয়; পরিকল্পিত পরিবহন দুর্ঘটনা কমায়; সবুজ এলাকা মানসিক চাপ কমায়। জননিরাপত্তা শুধু পুলিশ দিয়ে হয় না। এটা স্থাপত্য, পরিবেশ, পরিকল্পনার সমন্বয়।

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে– দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব, পারিবারিক সহিংসতা ও বৈষম্য অপরাধের জন্ম দেয়। এসব উপেক্ষা করে শুধু আইন প্রয়োগে কাজ হবে না। তরুণদের জন্য ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য জরুরি। একইভাবে অধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জননিরাপত্তার অংশ। আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, ভোট দিতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এড়াতে পারলে বেশি নিরাপদ বোধ করি। কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে সবকিছু শান্ত মনে হলেও তা বড় অনিরাপত্তার কারণ হতে পারে। 
দুর্যোগ প্রস্তুতিও নিরাপত্তার বড় অধ্যায়। জলবায়ু পরিবর্তন নতুন হুমকি তৈরি করছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ, খরা, ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড বাড়ছে। আমাদের রাষ্ট্র ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় পারদর্শিতা অর্জন করেছে; কিন্তু জলবায়ু নিরাপত্তায় মনোযোগ নেই। 

নাগরিকের নিরাপত্তা হচ্ছে ব্যক্তি, কমিউনিটি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে অংশীদারিত্ব। নাগরিকদের নিজের ভূমিকা পালন করতে হবে; কিন্তু রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে দক্ষতা, ন্যায় এবং সহমর্মিতার মাধ্যমে। একটা নিরাপদ সমাজ গড়ে ওঠে বিশ্বাস, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, জননিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; মানবমর্যাদার অন্যতম মৌলিক শর্ত।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×