প্রতিবেশী
পুরোনো দলগুলো নেপালের ‘জেনজি ভোট’ পাবে?
শামিক খারেল
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেপালের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৫ মার্চ বুধবার। একই সময় দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ভোটের জন্য নয়; বৈধতার জন্যও লড়াই করছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হাজার হাজার তরুণ নেপালের রাস্তায় নেমে পড়ে। তারা দুই দশক ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তারকারী একজন বয়স্ক নেতার পদত্যাগ দাবি করে।
সামাজিক মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে জেনজির নেতৃত্বে বিক্ষোভগুলো শিগগিরই স্থবির অর্থনীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর বিদ্রোহে পরিণত হয়। এর ফলে ৭৪ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
এই বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ওলির কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফায়েড মার্কসবাদী লেনিনবাদী (সিপিএন-ইউএমএল), সাবেক মাওবাদী বিদ্রোহীদের সমন্বয়ে গঠিত নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এবং মধ্যপন্থি নেপালি কংগ্রেস পার্টি। অনেক তরুণ নেপালি এই দলগুলোকে দুর্নীতিপ্রবণ মনে করে। বৃহস্পতিবারের ভোট সামনে রেখে দলগুলো দাবি করেছে, তারা গত বছরের বিদ্রোহ থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তরুণ কর্মীরা এতে আশ্বস্ত হয়নি।
রাজধানী কাঠমান্ডুর ২৭ বছর বয়সী ব্যবসায় বিভাগের ছাত্র রাজেশ চন্দ। তাঁর মতে, ভোট এখন আর দলীয় মার্কায় আটকে নেই। ‘আমার আগ্রহ দেশের অগ্রগতি নিয়ে। আমরা বহু বছর ধরে পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে আছি, কেউ কিছুই করেনি। দেশ রসাতলে যাচ্ছে। আমাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আর এটাই শুরু।’
বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ২৬ বছর বয়সী রক্শি বাম। তিনি বলেন, বিতর্ককে কেবল পুরোনো বনাম নতুন হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। ‘যদি একটি পুরোনো দল আমাদের সংস্কারের এজেন্ডাকে সমর্থন দেয় এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। ‘আর নতুনদের জেনজি বিপ্লবের মূলকথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’
তিনি বলেন, অনেক দল তাদের ইশতেহারে আন্দোলনের ভাষা যুক্ত করেছে। ‘আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।’ ‘কিন্তু আমরা তাদের গতিবিধি নজরে রাখব।’ অলি সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ দেশটির প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের (এনসি) চেয়ে অল্পসংখ্যক দলই এই বিদ্রোহে এতটা হতবাক হয়েছিল।
তবে অলির সিপিএন-ইউএমএলের জন্য ৫ মার্চের নির্বাচন যতটা টিকে থাকার বিষয়, ততটাই তার প্রতি জনআস্থা নবায়ন। অলি সরকারের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুং এই প্রতিযোগিতাকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। গুরুং যুক্তি দিয়েছিলেন, দলটি তরুণ নেতাদের যুক্ত করেছে, যার মধ্যে জেনজির কয়েক ডজন নেতাও রয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সিপিএন-ইউএমএল ‘সর্বদা দুর্নীতিবিরোধী এবং সুশাসনের জন্য জেনজির পক্ষে দাঁড়িয়েছে।’
তবে সামাজিক মাধ্যমের ওপর যার নিষেধাজ্ঞা বিক্ষোভের সূত্রপাত করেছিল, দলটি সেই অলিকে আবারও দলের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। অস্থিতিশীলতার পর সিপিএন-ইউএমএলের কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগের দাবি করলেও ভিন্নমত অকার্যকর ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুচেতা প্যাকুরেল বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ‘বেপরোয়া’ আচরণের কারণে এই বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়েছিল। হতাশা এই পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণ মূলধারার দলগুলো বারবার জনসাধারণের উদ্বেগ উপেক্ষা করেছে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ নেপালি ২৭৫ সদস্যের সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোট দেবেন। তাদের মধ্যে ১৬৫ জন সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন; ১১০ জন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। প্রায় আট লাখ মানুষ প্রথমবারের মতো ভোটার। ইশতেহারগুলোকে ‘প্রতিশ্রুতিপত্র’ বলে তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এটি জেনজিদের মাথায় রেখে ভাষার রাজনীতি পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্যাকুরেল এই পরিবর্তনকে ‘রাজনৈতিক ভোগবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ‘তারা নিজেদের পুনঃস্থাপন এবং পুনঃবিক্রয় করার চেষ্টা করছে।’ ‘নীতিগুলো উচ্চাভিলাষী শোনাচ্ছে, কিন্তু অনেকেই সংকটের কাঠামোগত মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে না।’
আন্দোলনের নেতা রক্শি বাম বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা রাজনৈতিক পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম নয়। ‘তরুণরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখে আমি আনন্দিত। ‘কিন্তু আমরা তাদের নিয়মিত প্রশ্নের মুখোমুখি করব। তারা আমাদের নজরদারিতে থাকবে।’ তিনি বলেন, আপাতত আমি সংসদের বাইরে সক্রিয় থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘আমি রাস্তার আন্দোলন শক্তিশালী করতে বিশ্বাস করি।’
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাইরের চাপের মধ্যে এই টানাপোড়েন নেপালের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। কেবল বক্তৃতার প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও বালেন শাহ জেনজির কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। যদিও তিনি এস্টাবলিশমেন্টের কাছে একজন আদর্শহীন রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচিত। গুরুং বলেন, ‘আদর্শ জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে আসে না। ভোটারদের এতে বিশ্বাস করা উচিত নয়। একটি দলের জন্য শক্তিশালী আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং লক্ষ্য প্রয়োজন। বালেন শাহর দলের কোনো লক্ষ্য নেই।’
আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- প্রতিবেশী
