ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

নেপালে বিজয়ী হলেও বাংলাদেশে কেন পারল না

নেপালে বিজয়ী হলেও বাংলাদেশে কেন পারল না
×

ড. মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালের প্রতিষ্ঠিত বহু পুরোনো পোড় খাওয়া, লড়াই-সংগ্রাম করা একাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। অথচ মাত্র তিন বছরের একটি নবীন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নির্বাচনে সবকটি দলকে ধরাশায়ী করেছে। অথচ ২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে দলটির অবস্থান ছিল চতুর্থ। কেন তাদের ক্ষমতা থেকে এত অপমানজনকভাবে বিদায় নিতে হলো তরুণদের গড়া দলের কাছে? 
বালেন্দ্র শাহর আলোচিত আরএসপি একটি মধ্যধারার রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি নেপালের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা পায়। নতুন প্রজন্ম ও শহুরে তরুণদের সমর্থন লাভ করে। গত বছর রাজনীতিক ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সন্তানরা ‘নেপো কিডস’ নামে পরিচিত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির অর্থে বিলাসী জীবনের সমালোচনায় সরকারের সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুতই ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। সেখানে পুলিশসহ ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন। বালেন্দ্র সেই আন্দোলনে প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং কেপি ওলিকে সন্ত্রাসী ও বেইমান বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই সময় তরুণদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, কাঠমান্ডুর দুর্নীতিমুক্ত মেয়র বালেন শাহর জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাদের এমন বক্তব্য নির্বাচনে তাদের বিপুল বিজয় এনে দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলে বিস্মিতদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোকরাজ বড়াল। তিনি ‘দ্য পোস্ট’কে বলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল ‘অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীন’। বড়ালের মতে, ‘নির্বাচনী ফলাফল যেন এক সুনামির মতো। জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভের কারণেই আরএসপির দিকে মানুষের ব্যাপক ঝোঁক দেখা গেছে। 

৫ মার্চের নির্বাচনে বিলুপ্ত সংসদের প্রধান দল নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি গগন থাপা আরএসপির অমরেশ কুমার সিংয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান। আরএসপি নেতা বালেন্দ্র শাহর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতা কেপি শর্মা ওলি। শীর্ষ তিন নেতার মধ্যে শুধু নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পুষ্পকমল জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে– ভোটাররা সব পুরোনো রাজনৈতিক দলের ওপর আস্থা হারিয়েছেন।

আরএসপি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও আদর্শ নিয়ে হাজির না হলেও মানুষ চেয়েছে তাদের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন। সেই আকাঙ্ক্ষাতেই জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে। দলটির বিজয়ের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে–১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান; ২. বালেন্দ্রর তরুণ প্রজন্মের নতুন রাজনীতির প্রতীক হয়ে ওঠা; ৩. প্রচলিত রাজনৈতিক দল-ধারার প্রতি হতাশা ও অনাস্থা; ৪. সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, নাগরিক অধিকার ও শহর উন্নয়নের অঙ্গীকার এবং ৫. ব্যতিক্রমী প্রচার-প্রচারণা ও দুঃশাসনবিরোধী ভূমিকা। 
এবারের সাধারণ নির্বাচনে মোট ৬৭টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। কিন্তু সংসদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ৭টি দল। নেপালের সংসদে মোট ২৭৫টি আসন। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন ও ১১০টিতে অনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়। নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফল– (সংখ্যানুপাতিকসহ) রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি ১২৫টি আসন, নেপালি কংগ্রেস ১৫টি, কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (এমএল) ১২টি, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি ১৩টি ও শ্রম-সংস্কৃতি পার্টি ৬টি, অন্যান্য দল পেয়েছে ২টি আসন। নেপালের জনসংখ্যা ৩ কোটি। এর মধ্যে ভোটার ছিলেন প্রায় পৌনে ২ কোটি। 
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় ১৩৮টি আসন। এ ক্ষেত্রে আরএসপিকে কোনো দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে। তবে আরএসপির এই কোয়ালিশন সরকারকে অতীতের সরকারের চেয়ে অধিক স্থিতিশীল সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে, যা নেপালের রাজনীতিকে অনেকটা স্থিতিশীল করবে বলে মনে করা হয়। বিগত ৩৫ বছরে নেপালে ৩২ বার ও গত ১৭ বছরে ১৩ বার সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, যার দায় পুরোনো এই দলগুলোর। 

নেপালের মতো বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী ছাত্ররা জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি নামে নতুন দলও গঠন করল। কিন্তু তারা এখানে বিকল্প হয়ে উঠতে ও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তারা এখানে বিতর্কিত, স্বাধীনতাবিরোধী ইসলামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট করে মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। 
অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে দলটি প্রশাসনিক অনেক সুবিধা পেলেও সুবিধা করতে পারেনি। মূলত অভ্যুত্থান-পরবর্তী তারা নিজেদের এতটা বিতর্কিত করে ফেলেছে যে, তারা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অথচ দ্বিদলীয় ধারা ও অপরাজনীতির বিপরীতে একটি বিকল্প ধারার উর্বর প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা থাকলেও সেটি তারা কাজে লাগাতে পারেনি। বরং ছাত্রদের মধ্যে যে ঐক্য ও সংহতি ছিল, সেটিও স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বহুধা-বিভক্ত ও সম্ভাবনাহীন।
 
ড. মঞ্জুরে খোদা: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×