চারদিক
শতবর্ষ পেরিয়ে কাশীপুর হাই স্কুল
মো. মাইন উদ্দিন
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশাল জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাশীপুর হাই স্কুল ও কলেজ। ১৯২০ সালে স্থানীয় দুটি জুনিয়র স্কুলকে একীভূত করে কাশীপুর হাই ইংলিশ স্কুল নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন বাবু অভয় কুমার ঘোষ ও বাবু শীতল চন্দ্র মুখার্জী। এটি বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ইছাকাঠী এলাকায় অবস্থিত। গত শতকের আশির দশকের শেষে ও নব্বই দশকের প্রথমদিকে আমি এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলাম। এসএসসি পাস করি ১৯৯২ সালে।
আমাদের সময় স্কুলটির ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল টিনশেডের। শিক্ষকদের বসার কক্ষ, অফিস ও দশম শ্রেণি ছিল দালানের। একমাত্র দশম শ্রেণিতে উঠতে পারলেই ওই সুন্দর জায়গায় বসে ক্লাস করার সুযোগ হতো। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন কল্পনা দিদি। তিনি আমাদের খুব ভালো করেই গ্রামার পড়িয়েছিলেন। অষ্টম শ্রেণিতে তাঁর বাংলা পড়ানোর কৌশলও ছিল চমৎকার।
ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত গণিত পড়াতেন সিদ্দিক স্যার। আমাদের কাছে মনে হতো, গণিতের পুরো বইটিই তাঁর মুখস্থ। এখানে সবার নাম ধরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। হাবিবুর রহমান স্যার, গণিতের মাহমুদ স্যার, বিজ্ঞানের হারুন স্যার, ইংরেজির নাসির স্যার, ধর্ম পড়াতেন মজিবুল হুজুর।
আমাদের সময় স্কুলে প্রাইভেট পড়ানোর তেমন প্রচলন ছিল না। কেউ কেউ পরীক্ষায় ভালো করার জন্য কিংবা ক্লাসে পড়া বুঝতে না পেরে কখনও কখনও প্রাইভেট পড়ত। আমাদের কোনো শিক্ষক ক্লাসে কম পড়িয়ে প্রাইভেট পড়ানোর প্রতি ইঙ্গিত করতেন না। তারা হয়তো সেরা শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু যা জানতেন শিক্ষার্থীদের তা জানাতে মোটেও কার্পণ্য করতেন না। পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর উপদেশ দিতেন। এসব কারণেই শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখনও অটুট।
স্কুলের বড় খেলার মাঠটি ঘিরে রয়েছে আমাদের অনেক স্মৃতি। এ মাঠেই ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলির জন্য সবাই দাঁড়িয়ে যেতাম। ১০ মিনিটের মতো শারীরিক কসরত করে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় সবাই মিলে জাতীয় সংগীত গাইতাম। সংগীত শেষে শপথবাক্য পাঠ করে নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে চলে যেতাম। এ মাঠেই দাঁড়িয়াবান্ধা-ফুটবল-ভলিবল-হ্যান্ডবল খেলতাম।
জন্মলগ্ন থেকেই এ প্রতিষ্ঠান এতদঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছে। ১৯২২ সালে এই স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৯ জন প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ছয়জন প্রথম বিভাগে ও তিনজন দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯২৪ সালে ১৭ জন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সবাই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে আজ অনেকেই দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত।
স্কুলটি শতবর্ষ অতিক্রম করলেও তা উদযাপন করা হয়নি। এ জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাব যতটা দায়ী, তার থেকে বেশি দায়ী ছিল এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষ অনুষ্ঠানে কে হবেন প্রধান অতিথি ও কে কে বিশেষ অতিথি– এ সংক্রান্ত রাজনৈতিক সমস্যা।
তবু এ বছর ৩০ জানুয়ারি এক দল প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় দিনব্যাপী একটি মিলনমেলা হয়ে গেল। এ উপলক্ষে কেউ তাঁর স্কুলে এসেছেন ৪০ বছর পর। একজন এসেছেন সুদূর মার্কিন মুল্লুক থেকে। আবেগাপ্লুত হয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন অনেকক্ষণ। গল্প-আড্ডায় কখন যে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে, টেরই পাইনি। বিদায়ের সুর বেজে উঠেছে। অধ্যক্ষ স্যার সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। আমাদের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনের হাহাকার ও ছটফটানি উপেক্ষা করে সবাই বিদায় নিলাম। এত মায়া স্কুলটির জন্য আগে কখনও এমনভাবে অনুভব করিনি।
ড. মো. মাইন উদ্দিন: অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- চারদিক
